শনিবার, মে ৩০, ২০২০

লিবিয়ায় যেভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় গোপালগঞ্জের সুজনকে

  |   শনিবার, ৩০ মে ২০২০ | প্রিন্ট  

লিবিয়ায় যেভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় গোপালগঞ্জের সুজনকে

সুজনের স্বজনদের আহাজারি

পরিবারে সুখ আর স্বাচ্ছন্দের জন্য মা-বাবাকে ছেড়ে সুদূর লিবিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিল গোপালগঞ্জের মুকসদুপুর উপজেলার দুই যুবক সুজন মৃধা ও ওমর শেখ। কিন্তু লিবিয়ায় মানব পাচারকারীদের গুলিতে প্রাণ দিতে হল সুজনকে। আর আহত হয়ে হাসপাতালে জীবন-মরনের সন্ধিক্ষণে রয়েছে ওমর। নিহত ও আহত দুই যুবকের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। পরিবারের স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে আকাশ-বাতাস।
জানা গেছে, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার গোহালা ইউনিয়নের বামনডাঙ্গা গ্রামের এইসএসসি পড়ুয়া ছাত্র সুজন মৃধা। মা-বাবা ও ভাইসহ পরিবারের রয়েছে ৬ সদস্য। বাবা কাবুল মৃধা করেন কৃষি কাজ। পরিবারের সদস্যেদের সুখ ও অভাব মেটাতে একই ইউনিয়নের যাত্রাবাড়ী গ্রামের দালাল রব মোড়লের মাধ্যমে ৩ লক্ষ ৯০ হাজার টাকা দিয়ে গত চার মাস আগে লিবিয়া পাড়ি জমান যুবক সুজন। লিবিয়ার কাজের বিনিময়ে মাস প্রতি দেয়ার কথা ছিল ৩৫ হাজার টাকা।
কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর কাজ তো দূরের কথা সুজনের ওপর নেমে আসে অমানবিক নির্যাতন। মেরে ফেলার ১৭ দিন আগে সুজনকে ওই দেশে মানব পাচারকারী চক্রের হাতে তুলে দেয়।
২৬ মে পাচারকারীরা সুজনের কাছে আরো ১০ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। ১০ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে ভয়েস কল পাঠাতে বলে দেশে। পরে ওই দেশে অবস্থানকারী বাংলাদেশি আমীর দালালের মোবাইল ফোন থেকে নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে ভয়েস কল পাঠানো হয় এবং সোমালিয়ায় আহমেদ মোহাম্মদ আদম সালামের ব্যাংক হিসেবে (ব্যাংক অ্যাকাউন্ড নং-০০২৫২৬১৫৮৩৭৪৪৯, সোমালিয়া, মগদিশা) মুক্তিপণের টাকা পাঠাতে বলা হয়।
ওই ভয়েস কলে সুজনকে মারপিট করার ভয়েস পাঠান। তখন সুজনের বাবা তাদের কাছে ১ জুন পযর্ন্ত সময় চান। কিন্তু তার আগেই ওরা সুজনকে গুলি করে হত্যা করে।
পরে সুজনের মৃত্যুর খবর পরিবারের কাছে আসলে স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে আকাশ বাতাস। মা, বাবা আর ভাই সুজনকে হারানোর বেদনায় বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। সন্তান ও ভাইয়ের লাশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে তারা।
নিহত সুজনের বাবা কাবুল মৃধা জানান, তিনি অভাবগ্রস্ত মানুষ। সামান্য কিছু কৃষি জমি ও চার্গাচাষাবাদ করে ৬ সদস্যের পরিবার কোনরকমে চলছিলো। তখন প্রতিবেশী যাত্রাপুর গ্রামের বর মোড়ল ৩ লক্ষ টাকায় ছেলেকে লিবিয়া পাঠিয়ে দেয়ার কথা বলেন। সেখানে রংয়ের কাজ দেয়া হবে এবং মাসে ৩৫ হাজার টাকা বেতন দেয়া হবে বলে জানান।
তখন তিনি স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে সুদে ও কিছু জমি বন্ধক রেখে রব মোড়লকে ২ লক্ষ ৯০ হাজার টাকা দেন। জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে ছেলেকে বর মোড়ল লিবিয়া পাঠায়। বর মোড়ল মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রামের মানব পাচারকারী জুলহাস শেখের মাধ্যমে ছেলেকে লিবিয়া পাঠান। সেখানে যাওয়ার পর ছেলেকে কোন কাজ দেয়নি দালাল চক্র। বরং গুলি করার১৭ দিন আগে ছেলেকে লিবিয়ায় মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেন। কিন্তু তার আগেই তারা আমার ছেলেকে মেরে ফেলেছে। আমি এখন আমার সন্তানের লাশ ফেরত চাই আর এ ঘটনার সাথে জড়িত মানব পাচারকারীদের বিচার চাই।
নিহতের মা চায়না বেগম (৪৫) কান্নাজনিত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলেকে আমার বুকে ফিরায় দেও। আমার ছেলেকে দালালরা নিয়ে গিয়ে ১৭ দিন কোন খাবার দেয়নি। মারপিট করেছে। পরে মুক্তিপণ দাবি করে গুলি করে হত্যা করেছে। আমি আমার সন্তানের লাশ চাই। আর ঘটনার সাথে জড়িত দালালদের ফাসিঁ চাই। যাতে তারা আর কোন মায়ের কোল খালি করতে না পারে।
অপরদিকে, একই উপজেলার সুন্দরদী গ্রামের মো. কালাম শেখের ছেলে ওমর শেখ (২২) ৪ লক্ষ ৫ হাজার টাকা দিয়ে দালাল লিয়াকত মোল্লার মাধ্যমে লিবিয়া গিয়েছিলেন। তারপরেও চলে নির্যাতন। কাঠুরে বাবা পরিবারে একটু স্বচ্ছলতার জন্য ছেলেকে ৪ লক্ষ ৫ হাজার টাকা দিয়ে একই গ্রামের দালাল লিয়াকত মোল্লার মাধ্যমে ছেলেকে লিবিয়া পাঠান। বতর্মানে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় লিবিয়ার ত্রিপলি হাসপাতালে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন।
আহত ওমর শেখের কালাম শেখ ও মা শাহিদা বেগম তার আহত ছেলেকে ফেরত চেয়েছেন। একই সাথে তারা মানব পাচারকারী দালাল চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করে ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন।
একই দাবি জানিয়ে ওই গ্রামের জয়নাল সরদার (৬৫), লিটন মৃধা (৪৫), আকিজুল ইসলাম বাবুল (৬৫) বলেছেন, এই দালাল চক্র হাতে গোহালা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের আরো বেশকিছু যুবক বন্দি আছে। আমরা তাদেরকে উদ্ধারের দাবি জানাচ্ছি। একই সাথে দালালদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি করছি।
গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা জানান, আমরা বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে জেনেছি। পরে খোঁজ-খবর নেয়ে পরিবারের সাথে কথা বলা হয়েছে। আমারা তাদেরকে সহাযোগীতা করার আশ্বাস দিয়েছি। এখন সমস্যা হলে মৃতদেহ দেশে ফিরেয়ে আনা। ইতিমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে।
তিনি আরো বলেন, দালাল চক্রের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত আমরা কোন অভিযোগ পাইনি। এখন মনে হচ্ছে আমাদের এখানে একটি সক্রিয় দালাল চক্র রয়েছে। যারা মানব পাচারের কাজ করছে। এখন তাদের তথ্য সংগ্রহ করে বা কোন অভিযোগ পাই তাহলে দালালদের ধরে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করবো।


Posted ৫:১৭ অপরাহ্ণ | শনিবার, ৩০ মে ২০২০

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

Archive Calendar

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।

হেল্প লাইনঃ ০১৭১২১৭০৭৭১

E-mail: [email protected] | [email protected]