শুক্রবার, জুন ৫, ২০২০

লিবিয়ায় খোঁজ নেই ১০ বাংলাদেশির

  |   শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২০ | প্রিন্ট  

লিবিয়ায় খোঁজ নেই ১০ বাংলাদেশির

‘ভাই, মাফিয়ারা আমাগো আটকাইছে। আমার কাছে ১২ হাজার ডলার চাইতাছে, বুঝছো? আমারে তুমি বাঁচাও ভাই। দু-এক দিনের মধ্যে যেমনেই হোক ১২ হাজার ডলার পাঠাও। আমি একটা অ্যাকাউন্ট নাম্বার দিমু, সেই নাম্বারে পাঠাইয়া দেও। নাইলে ভাই মাইরা লাইবো, দুইডারে মাইরা লাইছে। ও ভাই রে, তোমরা আমারে যেমনেই হোক বাঁচাও।’
লিবিয়ার মিজদাহ শহর থেকে গত ২০ মে বিকেল ৪টা ৪৭ মিনিটে ছোট ভাই তোফাজ্জল তালুকদারের কান্নাকাটি আর মারধরের শব্দসহ বাঁচার আকুতির এমন একটি মেসেজ পান কাউসার তালুকদার। ওই মেসেজ পেয়ে ছোট ভাইকে বাঁচাতে টাকার জন্য ছুটতে থাকেন তিনি। ওদিকে টাকার জন্য তোফাজ্জলের ওপর দিনরাত চলে অকথ্য নির্যাতন। সেই নির্যাতন আর কান্নার শব্দ সাতবার পাঠানো হয় কাউসারের কাছে। সর্বশেষ ২৬ মে বিকেল ৩টা ৩ মিনিটে টাকার জন্য কাউসারের কাছে ভয়েস পাঠান তোফাজ্জল। লিবিয়ার হামরারি নামের ইমো নম্বর থেকে মেসেজটি পাঠানো হয়।
জিম্মিকারীদের কাছে টাকা পাঠানোর শেষ সময় ছিল জুন মাসের ১ তারিখ। তার আগেই খবর আসে যে ২৪ প্রবাসী বাংলাদেশিসহ ২৬ জনকে ব্রাশফায়ার করে মেরে ফেলেছে সন্ত্রাসীরা। ওই ঘটনায় আহত হয়েছে আরো ১১ প্রবাসী বাংলাদেশি। বিভিন্ন মিডিয়ায় হতাহতদের তালিকাও প্রকাশ পায়। সেই তালিকায় অবশ্য নাম নেই তোফাজ্জলের।
কাউসার বলেন, ‘ঘটনার দুই দিন আগেও ভাই আমার বাঁচার জন্য মেসেজ দিয়ে আকুতি জানাল, ঘরবাড়ি বন্ধক রেখে এবং জমি বিক্রি করে টাকাও জোগাড়ের চেষ্টা করছিলাম। দেওয়ার কথা ছিল ১ জুন। কিন্তু তার আগেই শুনলাম ভয়ংকর ঘটনার খবর। কিন্তু ভাইটির লাশ কিংবা আহতদের তালিকায় ওর নাম নেই। তাহলে আমার ভাইটির কী হলো?’
জানা গেছে, মালয়েশিয়াপ্রবাসী হাজি মোতালেব তালুকদারের ছোট ছেলে তোফাজ্জল তালুকদার। মোতালেব তালুকদার ১৮ বছর ধরে মালয়েশিয়ায় থাকেন। ২০১৯ সালের মে মাসে খালাতো ভাইয়ের মাধ্যমে দুবাই-মিসর হয়ে লিবিয়ার বেনগাজিতে যান তোফাজ্জল। বেনগাজিতে বছরখানেক অবস্থান করে গত ১৫ মে তিনি ত্রিপলির উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু পথেই মিজদাহ শহরে তাঁকে জিম্মি করা হয়। ছেলের এমন ঘটনা শুনে অসুস্থ হয়ে মোতালেব এখন কুয়ালালামপুরে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।
তোফাজ্জলের মতোই সেদিনের ওই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর থেকে খোঁজ মিলছে না কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার আব্দুল্লাহপুর গ্রামের ইউনুস মিয়ার ছেলে সাদ্দাম হোসেনের। সাড়ে চার লাখ টাকা ব্যয়ে কেরানীগঞ্জের দালাল নীরব মিয়ার মাধ্যমে দুবাই-মিসর হয়ে লিবিয়ার বেনগাজিতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মানবপাচারকারী চক্রের জিম্মি দশা থেকে বাঁচার আকুতি জানিয়ে বারবার ফোন করলেও দিনমজুর বাবা মুক্তিপণের টাকা দিতে পারেননি। কারণ একমাত্র সম্বল ২০ কাঠা জমি বিক্রি আর ঋণ করে সাড়ে চার লাখ টাকায় ছেলেকে লিবিয়া পর্যন্ত পাঠিয়েছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে ইউনুস মিয়া বলেন, ‘টাকার জন্য পোলাডারে অনেক নির্যাতন করছে। কিন্তু দিমু কইত্থেকে? পরে শুনলাম ওরা ২৬ জনকে মাইরা ফেলছে। কিন্তু আমার পোলার কোনো খোঁজ কেউ দিতে পারতেছে না। বাইচ্যা আছে নাকি মইরা গেছে তা-ও জানি না।’
মিজদাহ শহরে ২৬ বাংলাদেশিসহ ৩০ জনকে পাচারকারীরা জিম্মি করে গুলি করে হত্যা করে। সেখানে আরো ১১ বাংলাদেশি গুরুতর আহত হন। ঘটনাস্থল ত্রিপলি শহর থেকে ১৮০ কিলোমিটার দক্ষিণে। মানবপাচারকারীরা মোট ৩৮ জনকে জড়ো করে। পরে মুক্তিপণ আদায়ের জন্যে মিজদাহ শহরে নিয়ে শুরু করে নির্যাতন। লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস ২৬ প্রবাসীর মৃত্যু এবং ১১ জন আহত হওয়ার কথা বললেও নিখোঁজদের পরিবারের দাবি, আরো বেশ কিছু প্রবাসী নিখোঁজ রয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই হত্যাকাণ্ডের পর তোফাজ্জল, সাদ্দামসহ কমপক্ষে ১০ জন প্রবাসী বাংলাদেশি নিখোঁজ রয়েছেন। কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌর শহরের জগন্নাথপুর এলাকার আশিক মিয়ার ছেলে বিজয়ের কোনো খোঁজ পাচ্ছে না পরিবার। নিখোঁজ একই মহল্লার আক্তার মিয়ার ছেলে সজলও। স্থানীয় দালাল জাফর আহমেদের মাধ্যমে চার লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে তাঁদের লিবিয়ায় পাঠানো হয়।
নিখোঁজদের মধ্যে আরো রয়েছেন ভৈরবের কালিকা প্রসাদপুরের জিন্নত আলী মিয়ার ছেলে মাহাবুব, অষ্টগ্রাম উপজেলার আব্দুল্লাহপুর গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে ইসরাইল হোসেন, মাদারীপুর সদরের দুদখালী গ্রামের আব্দুল হালিমের ছেলে জাকির হোসেন এবং কুনিয়া গ্রামের খালেক আকন্দের ছেলে মনির আকন্দ।
অন্যদিকে লিবিয়ার বেনগাজি থেকে ত্রিপলি যাওয়ার পর থেকে পাঁচ মাস ধরে খোঁজ নেই ফরিদপুরের সালথা উপজেলার মাঝারদিয়া গ্রামের দুলাল হোসেন মাতব্বরের ছেলে আছমত আলী, আলমগীর হোসেনের ছেলে জিয়াদ হোসেন এবং জাকির মাতব্বরের ছেলে সাজ্জাদের। স্থানীয় ইতালিপ্রবাসী দালাল আব্দুর রবের মাধ্যমে লিবিয়ার দালালদের সহায়তায় ১০ লাখ টাকা খরচ করে তাঁরা লিবিয়ায় যান। সূত্র: কালের কণ্ঠ।


Posted ৮:৫৮ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২০

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

Archive Calendar

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।

হেল্প লাইনঃ ০১৭১২১৭০৭৭১

E-mail: [email protected] | [email protected]