• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    লিভার প্রদাহের অন্যান্য কারণ

    অগ্রবাণী ডেস্ক | ০৭ মে ২০১৭ | ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ

    লিভার প্রদাহের অন্যান্য কারণ

    গত দুই পর্বে প্রকাশিত ব্যাকটেরিয়া ছাড়াও অন্যান্য ব্যাকটেরিয়াও লিভারকে আক্রান্ত করতে পারে। তবে সংখ্যার বিচারে এ ধরণের রোগীদের সংখ্যা তুলনামূলক কম। একটিনোমাইসিস প্রজাতি লিভারে অ্যাবসেস করে। এটি অন্ত্রনালী থেকে পোর্টাল শিরার মাধ্যমে লিভারে ছড়ায়। রোগীদের জ্বর আসে, ঘাম হয়, ওজন কমে যায় এবং রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। লিভার বড় হয়ে যেতে পারে এবং ধরলে ব্যথা হয়। এই রোগের একটি বৈশিষ্ট্য হল সাইনাস তৈরী হওয়া। সাইনাস হলো একটি নাড়ী যা দুটো দেয়ালকে পরস্পর যুক্ত করে। উচ্চমাত্রার পেনিসিলিন, ডক্সিসাইক্লিন ও ক্লিনডামাইসিন নামক এন্টিবায়োটিক দিয়ে এই রোগের চিকিত্সা করা হয়।


    Treponema pallidum নামক ব্যাকটেরিয়া দিয়ে হয় যৌনবাহিত রোগ সিফিলিস। এটি মূলত জনন অঙ্গকেই প্রথমে আক্রান্ত করে এবং চিকিত্সা না করলে রক্তের মাধ্যমে রক্তের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। এটি লিভারকেও আক্রান্ত করতে পারে। মায়ের সিফিলিস থাকলে গর্ভস্থ বাচ্চায় এটি প্রবেশ করতে পারে, যা বাচ্চার মৃত্যু ও গর্ভপাতের কারণ হতে পারে। সময়মত রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা গ্রহণের কারণে সিফিলিস রোগীর সংখ্যা অনেক কমে গিয়েছে। মূলত এন্টিবায়োটিক সেবন করে এই রোগের চিকিত্সা করতে হয়।

    ajkerograbani.com

    Borrelia recurrentis নামক ব্যাকটেরিয়া দিয়ে হয় রিলাপসিং ফিভার। এই জীবানু লিভার, স্প্লিন, মস্তিষ্ক ও অস্থিমজ্জাকে আক্রমণ করে। আক্রান্ত রোগীর উচ্চ তাপমাত্রার জ্বর, মাথা ব্যথা ও মাংসপেশীর ব্যথা হয়। মারাত্মক আক্রমণ হলে লিভার ও স্পিলন বড় হয়ে যায় এবং জন্ডিস দেখা দেয়। মাইক্রস্কোপী ও সিএফটির মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা হয়। সেফট্রায়াক্সোন ও টেট্রাসাইক্লিন দিয়ে এটি চিকিত্সা করা হয়।

    লাইম ডিজিজ, কিউ ফিভার, রকি মাউন্টেইন স্পটেড ফিভার এবং ক্যাট স্ক্র্যাচ ডিজিজ-এ লিভার আক্রান্ত হতে পারে। রোগভেদে হালকা জন্ডিস হতে পারে এবং লিভার বড় হয়ে যায়। পরীক্ষানিরীক্ষা করলে রক্তে বিলিরুবিন স্বাভাবিক বা হাল্কা বেশী এবং লিভার এনজাইম বেশি পাওয়া যেতে পারে। রোগভেদে সুনির্দিষ্ট এন্টিবায়োটিক প্রয়োগে চিকিত্সা করা হয়।

    লিভার ও কৃমি-

    মানবদেহের খাদ্যনালী থেকে ও রক্তনালী দিয়ে কৃমি লিভারে প্রবেশ করতে পারে। যে কৃমিগুলো লিভারকে আক্রামণ করে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- Echinococcus gramulosus, Ascarias lumbricoides, Fasciola hepatica, Schistosoma mansoni ও Schistosoma japonicum. লক্ষ্যনীয় Echinococcus granulosus লিভারে হাইডাটিড ডিজিজ করে যা পৃথকভাবে উপরে আলোচনা করা হয়েছে। বাকীগুলোর মধ্যে Ascarias সাধারণত: বাংলাদেশে পাওয়া যায়। Fasciola এবং Schistosoma বাংলাদেশে কম পাওয়া যায়। কৃমি বাহিত প্রতিটি রোগ থেকে বাঁচার উপায় হলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা। সতর্কতার সাথে পানি ব্যবহার। পরিষ্কার করে শাক সবজি ও খাবার ধুয়ে ও রেঁধে খাওয়া। এছাড়া আমাদের দেশে স্কুলে সরকারীভাবে কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানোর যে কর্মসূচি আছে তাতে অংশগ্রহণ করে নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধ সেবন করলেও এ সকল রোগ থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব।

    হেপাটিক অ্যাসকারিয়াসিস-

    Ascarias lumbricoides নামক কৃমি মানবদেহের খাদ্যনালীতে থাকে। এটি দূষিত খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের অন্ত্রে প্রবেশ করে এবং এখানে বড় হতে থাকে। একেকটি কৃমি ২০ থেকে ৩৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এটি খাদ্যনালী থেকে পিত্তনালীতে প্রবেশ করে প্রদাহ করে। অত:পর এখান থেকে লিভারে প্রবেশ করে হেপাটিক অ্যাসকারিয়াসিস করে। পিত্তনালী ও লিভার আক্রান্ত ব্যক্তির পেটের উপরিভাগে ও ডানদিকে ব্যথা হয়। এছাড়া বমিভাব ও জ্বর থাকতে পারে। খাদ্যনালীতে থাকলে মলের সাথে অ্যাসকারিয়াস-এর ডিম পাওয়া যায়। যা দিয়ে অন্ত্রে উক্ত কৃমির উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়। এছাড়া রক্তে ইউসিনোফিল নামক শ্বেত রক্তকণিকা বেড়ে যায়। আলট্রাসনোগ্রাম ও এন্ডোস্কোপিক রেট্রোগ্রেট কোলাঞ্জি ও প্যানিক্রিয়েটোগ্রাফী (সংক্ষেপে ইআরসিপি) নামক পরীক্ষা করে পিত্তনালী ও লিভারে কৃমির উপস্থিতি নির্ণয় করা হয়। অ্যালবেনডাজল ওষুধ খেলে কৃমি মারা যায় এবং ইআরসিপি ও সার্জারীর মাধ্যমে কৃমি অপসারণ করতে হয়।

    হেপাটিক ফ্লুক-

    Fasciola hepatica নামক পরজীবী (কৃমি) দিয়ে হয় হেপাটিক ফ্লুক। এটির মেটাকারসারী নামক দশা দূষিত কাঁচা সবজি ও সালাদের মাধ্যমে খাদ্যনালীতে প্রবেশ করে। অত:পর পোর্টাল শিরার মাধ্যমে লিভারে প্রবেশ করে। আক্রান্ত রোগীদের পেটের ডান দিকের উপরিভাগে ব্যথা হয়, জ্বর আসে এবং লিভার বড় হয়ে যায়। রক্তে ইউসিনোফিলের পরিমাণ বেড়ে যায়। মলের সাথে উক্ত কৃমির ডিমের উপস্থিতি নির্ণয় করে হেপাটিক ফ্লুক-এর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। চিকিত্সা করতে হয় ট্রাক্লাবেনডাজল নামক ওষুধ প্রয়োগ করে।

    সিসট্রোসোমিয়াসিস-

    Schistosoma japonicum এবং Schistosoma mansoni এই দুটো প্রজাতির কৃমি লিভারের সিস্টোসোমিয়াসিস করে। সিসট্রোসোমিয়া হেমাটোবিয়াম নামক আরেকটি প্রজাতি প্রধানত মূত্রথলীকে আক্রান্ত করে। সিসট্রোসোমিয়া মূলত দূষিত পানি থেকে মানুষের ত্বকের মধ্য দিয়ে শিরা পথে প্রবেশ করে এবং খাদ্যনালী, লিভার ও প্লীহায় ছড়িয়ে পড়ে। পোর্টাল শিরার মাধ্যমে লিভারে প্রবেশ করলে এটির বিরুদ্ধে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যক্রম শুরু হয়। ফলে পোর্টাল শিরার পাশে ফাইব্রসিস হয়। এটি দীর্ঘ দিন লিভারকে আক্রান্ত করে রাখতে পারে। ফলে লিভারের অনেক স্থান জুড়ে ফাইব্রোসিস হয়, পোর্টাল শিরার প্রেসার বেড়ে যায় এবং প্লিন বড় হয়ে যায়।

    আক্রান্ত রোগীর দেহে কৃমি প্রবেশ করার সময় জ্বর হয়, শরীরে চাকা চাকা গোটা আকৃতির ফোলা দেখা দেয় এবং রক্তে ইউসিনোফিল বেড়ে যায়। এছাড়া যে স্থান দিয়ে কৃমি প্রবেশ করে সে স্থানে প্রতিক্রিয়ার ফলে সমান্তরালে ফুলে যেতে পারে। এরপর কৃমি লিভারে ও প্লীহায় প্রবেম করলে ধীরে ধীরে লিভার ছোট হয়ে আসে এবং প্লীহা বড় হয়ে যায়। পোর্টাল শীরার প্রেসার বেড়ে ফুলে গেলে মুখ দিয়ে রক্ত বমি হয়। প্রস্রাস, মল ও মলদ্বারের বায়োপসি করে কৃমির ওভা নির্ণয় করার মাধ্যমে রোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। প্রিজাকুয়েন্টেল নামক কৃমিনাশক দিয়ে সিস্টোসোমা চিকিত্সা করা হয়। মুখ দিয়ে রক্তবমি হলে স্ক্লেরোথেরাপী ও এন্ডোস্কোপিক ব্যান্ড লাইগেশনের মাধ্যমে চিকিত্সা করতে হয়।

    আলোচ্য প্রবন্ধে আমরা ভাইরাস ব্যতীত লিভারের অন্যান্য ইনফেকশন সম্পর্কে জানতে পারলাম। ভাইরাসজনিত লিভার প্রদাহ বেশি হলেও বর্তমান নিবন্ধে উল্লেখিত রোগীর সংখ্যা একান্তই কম নয়। এ কারণে রোগগুলো সম্পর্কে নিজেরা সচেতন হওয়ার পাশাপাশি অন্যদের তথ্য দিয়ে সচেতন করা আমাদের জন্য অতীব জরুরী। যথা সময়ে চিকিত্সা করা গেলে দ্রুত নিরাময় এবং রোগসৃষ্ট জটিলতা থেকেও রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

    Facebook Comments Box

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
    ১০১১১২১৩১৪
    ১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
    ২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
    ২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4757