• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    শবে মেরাজের ঘটনা, তাৎপর্য এবং দাবী

    মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম | ২৪ এপ্রিল ২০১৭ | ১:৫২ অপরাহ্ণ

    শবে মেরাজের ঘটনা, তাৎপর্য এবং দাবী

    ইসরা :


    মসজিদে হারাম বা কাবা শরিফ থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত ভ্রমণকে ইসরা বলা হয়। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, ‘পবিত্র তিনি, যিনি তাঁর বান্দাহকে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছেন। তাঁর চার দিক আমি বরকতময় করেছিলাম তাঁকে আমার কুদরতের নিদর্শন দেখানোর উদ্দেশ্যেই। নিশ্চয়ই তিনি স্বপ্নদ্রষ্টা’ (সূরা বনি ইসরাইল : ১)।

    ajkerograbani.com

    মেরাজ :

    মেরাজ শব্দের অর্থ সিঁড়ি বা ধাপ যার মাধ্যমে ওপরে ওঠা যায়। মসজিদুল আকসা থেকে সপ্ত আসমান পর্যন্ত ভ্রমণকে মেরাজ বলা হয়। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই তিনি (মুহাম্মদ) তাকে (জিব্রাইল আ:-কে) আরেকবার দেখেছিলেন সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে, যার কাছেই রয়েছে বসবাসের জান্নাত। তাঁর দৃষ্টিবিভ্রম হয়নি এবং তিনি সীমালঙ্ঘনও করেননি। নিশ্চয়ই তিনি তাঁর পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলি অবলোকন করেছেন’ (সূরা নজম : ১৪-১৭)।

    মেরাজের সংক্ষিপ্ত বিবরণ :

    বেশির ভাগ ওলামায়ে কেরামের মতে নবুয়্যতের দ্বাদশ সালে ২৭ রজব সোমবার রাতের শেষার্ধে রাসূল সা: তাঁর দুধ বোন উম্মে হানি বিনতে আবু তালিবের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এমন সময় আল্লাহর হুকুমে হজরত জিব্রাইল আ: একদল ফেরেশতাসহ এসে মহানবী সা:-এর সিনা মোবারক চিরে হাউজে কাউসারের পানি দ্বারা গোসল করিয়ে জান্নাতি পোশাকে নবীজীকে সুসজ্জিত করে আল্লাহর দিদারের কথা জানালে রাসূল সা: স্বতঃস্ফূর্ত চিত্তে রাজি হন। এরপর বোরাক যোগে মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসের দ্বারে উপনীত হন। সেখানে উপস্থিত লাখ লাখ নবী-রাসূল ও ফেরেশতারা তাঁকে অভিবাদন জানান এবং তাঁর পেছনে নামাজ পড়েন।

    অতঃপর তিনি সপ্ত আকাশ পরিভ্রমণ করেন। সেখানে প্রথম আকাশে হজরত আদম আ:, দ্বিতীয় আসমানে হজরত ইয়াহিয়া আ:, তৃতীয় আসমানে হজরত ইউসুফ আ:, চতুর্থ আসমানে হজরত ইদ্রিস আ:, পঞ্চম আসমানে হজরত হারুন আ:, ষষ্ঠ আসমানে হজরত মুসা আ:, সপ্তম আসমানে হজরত ইব্রাহিম আ:-এর সাক্ষাৎপর্ব শেষ করে তিনি সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছেন। সেখানে দিগন্ত বেষ্টিত সবুজ রঙের রফরফ (গদিবিশিষ্ট আসন) আসে এবং তিনি রফরফে চড়ে আরশে আজিমে উপস্থিত হন।সেখানেই সরাসরি আল্লাহর সাথে নবী মুহাম্মদ( স.) এর দিদার হয়। অতঃপর তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসে ফিরে আসেন।

    শবে মেরাজের উদ্দেশ্য :

    তাওহিদের নির্দেশাবলি আল্লাহর আয়াতগুলোর বাস্তবিক চাক্ষুষ প্রমাণ দেখিয়ে দেয়ার জন্য এবং এই বিশ্বের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব যে মহান আল্লাহরই, তা সরাসরি দেখানোই মেরাজের উদ্দেশ্য। তার এই ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার কেউ নেই। অতএব, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে দ্বীনের বিজয় ঠেকানোর সাধ্য কারো নেই। এই আস্থা ও বিশ্বাস মজবুত এবং সুদৃঢ় করাই মেরাজের মূল লক্ষ্য। আল্লাহ তায়ালার একান্ত সান্নিধ্যে হাজির হওয়া, ঊর্ধ্বলোক সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করা, অদৃশ্য ভাগ্যলিপি সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করা, ইহকাল, পরকাল, নভোমণ্ডল, বেহেশত, দোযখ সম্পর্কে প্রতক্ষ জ্ঞানলাভ করাও মেরাজের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। সর্বোপরি মদিনার ভাবী ইসলামি রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেয়ার উপযোগী করে গড়ার উদ্দেশ্যেই মহান স্রষ্টা তার প্রিয় নবীকে সান্নিধ্যে টেনে নিয়েছিলেন।

    শবে মেরাজের তাৎপর্য :

    ইসলামের ইতিহাসে মেরাজ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যখন সব দিক থেকে রাসূল সা: মারাত্মক সঙ্কট ও শোকের সম্মুখীন হয়েছিলেন, সেই দুঃসময়ে আল্লাহ পাক তাঁর প্রিয় হাবিবকে তাঁর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ দিয়েছিলেন। পার্থিব জীবনের অভিভাবক চাচা আবু তালেবের বিদায়, প্রাণপ্রিয় সহধর্মিণী উম্মুল মুমেনিন হজরত খাদিজা রা:-এর ইন্তেকাল, তায়েফের হৃদয়বিদারক ঘটনা, মক্কার কাফেরদের অমানবিক আচরণ, নির্যাতনসহ বিভিন্ন অনাকাংখিত ঘটনা রাসূলুল্লাহ সা:-এর জীবন বিপন্ন ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছিল। মেরাজের মাধ্যমে তাঁকে জানিয়ে দেয়া হয় রাতের পরই আসে ভোর। ইসলামের বিজয় সমাগত, যার জন্যই মূলত তিনি সংগ্রাম করছিলেন। সাথে সাথে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাকে পূর্ণতা লাভের সবকও দান করেছিলেন। আল্লাহ তাকে আলমে বারযাখ, জান্নাত, জাহান্নাম, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের সব কিছু প্রতক্ষ করান এবং অনন্ত রহস্যের ভাণ্ডার তার সামনে উন্মুক্ত করে দেন।

    সেই রাতেই আল্লাহর কাছ থেকে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের হুকুম জারি করা হয়। প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত সালাতের নির্দেশ দেয়ার পর রাসূল সা: তাঁর উম্মতের দুর্বল অবস্হার দিকে তাকিয়ে আল্লাহর কাছে আবেদন করেন এবং অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তা পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের বিধানে পরিণত করেন এবং পাঁচ ওয়াক্তকে পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমতুল্য করে দেন।
    মেরাজের মাধ্যমেই আরববাসীর সামনে ইসলামি রাষ্ট্রের নীলনকশা পেশ করা হয়। মেরাজ থেকে এসে সমগ্র বিশ্বের সামনে রাসূল সা: সেই নীলনকশা তুলে ধরেন।

    শবে মেরাজের প্রকৃত শিক্ষা :

    রাসূল সা: মেরাজ থেকে ফিরে আসার পর সূরা বনি ইসরাইলের মাধ্যমে ১৪টি দফা জনগণের সামনে পেশ করেন- যা নিম্নরূপ :

    ১। আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করো না, তাহলে তুমি নিন্দিত ও অসহায় হয়ে পড়বে। আর তোমরা কেবল আল্লাহরই বন্দেগি করো (সূরা বনি ইসরাইল-২২)।

    ২। বাবা-মার সাথে ভালো ব্যবহার করো। তাদের একজন বা উভয়ে বৃদ্ধ অবস্থায় যদি তোমাদের সামনে উপনীত হয় তাহলে তাদের সাথে উহ শব্দটি পর্যন্ত করো না। তাদের ধমকের সুরে জবাব দিয়ো না; বরং তাদের সাথে মর্যাদা সহকারে কথা বলো। আর তাদের সামনে বিনয়ি থেকো আর দোয়া করতে থাকো- ‘হে আমার প্রতিপালক, তাদেরকে তেমনিভাবে লালন-পালন করো, যেমনি তারা শৈশবে আমাদের লালন-পালন করেছেন’ (সূরা বনি ইসরাইল ২৩-২৪)।
    ৩। তোমাদের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চই আল্লাহ তোমাদের মনের খবর জানেন (সূরা বনি ইসরাইল-২৫)।
    ৪। আত্মীয়স্বজনকে তাদের অধিকার দাও আর মুসাফিরদের হক আদায় কর (সূরা বনি ইসরাইল-২৬)।
    ৫। অপব্যয় করো না, নিশ্চয়ই অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই, আর শয়তান স্বীয় প্রতিপালকের প্রতি অকৃতজ্ঞ (সূরা বনি ইসরাইল-২৭)।
    ৬। হকদারদের হক আদায়ে তুমি যদি অপারগ (অসমর্থ) হও তাহলে তাদের সাথে অত্যন্ত নম্রভাবে কথা বলো (সূরা বনি ইসরাইল-২৮)।
    ৭। ব্যয়ের ক্ষেত্রে বেহিসেবি হয়ো না, আবার কৃপণতাও প্রদর্শন কর না। আল্লাহ যাকে চান রিজিক বাড়িয়ে দেন, যাকে চান কমিয়ে দেন (সূরা বনি ইসরাইল : ২৯-৩০)।
    ৮। দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তান হত্যা করো না। নিশ্চয়ই এটি মহাপাপ (সূরা বনি ইসরাইল : ৩১)।
    ৯। জেনা-ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চই এটি নিকৃষ্ট ও গর্হিত কাজ (সূরা বনি ইসরাইল : ৩২)।
    ১০। কোনো জীবনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করো না। কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলে তার উত্তরাধিকারীকে আমি এই অধিকার দিয়েছি (চাইলে রক্তের বিনিময় চাইতে পারে), তবে প্রতিশোধের ব্যাপারে সে যেন বাড়াবাড়ি না করে (সূরা বনি ইসরাইল : ৩৩)।
    ১১। এতিমের সম্পদের ধারেকাছেও যেও না। সম্পদের ব্যাপারে তার বয়োপ্রাপ্তি পর্যন্ত অপেক্ষা করো আর প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে সচেতন থাক। নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে (সূরা বনি ইসরাইল : ৩৪)।
    ১২। ওজনে কখনো কম দিয়ো না। দাঁড়িপাল্লা সোজা করে ধরবে- এটিই উত্তম পন্থা (সূরা বনি ইসরাইল : ৩৫)।
    ১৩। যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই সেগুলোর পেছনে লেগো না। নিশ্চয়ই চোখ, কান, অন্তর সব কিছুই জিজ্ঞাসিত হবে (সূরা বনি ইসরাইল : ৩৬)।
    ১৪। জমিনে দম্ভসহকারে চলো না। এগুলো সবই মন্দ ও ঘৃণিত কাজ (সূরা বনি ইসরাইল : ৩৭-৩৮)।
    এই ১৪ দফাই শবে মেরাজের প্রকৃত শিক্ষা। শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা রাসূল সা: মদিনায় গিয়ে কায়েম করেছিলেন, এগুলো তার বুনিয়াদি মূলনীতি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের বুঝার এবং আমল করার তাওফিক দিন। আমিন।
    Email: zahid.zahid19@gmail.com
    ইসলামী লাইব্রেরী : www.library.zdesignbd.com

    Facebook Comments Box

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
    ১০১১১২১৩১৪
    ১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
    ২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
    ২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4757