বুধবার, জুলাই ১৩, ২০২২

শিনজো আবে হত্যাকাণ্ড: বাংলাদেশ হারাল অকৃত্রিম বন্ধুকে

দয়াল কুমার বড়ুয়া   |   বুধবার, ১৩ জুলাই ২০২২ | প্রিন্ট  

শিনজো আবে হত্যাকাণ্ড: বাংলাদেশ হারাল অকৃত্রিম বন্ধুকে

জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৩০-এর দশকের পর জাপানে এই প্রথম কোনো বর্তমান বা সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা করা হলো। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি শিনজোর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার শোক বার্তায় বলেন, শিনজো আবের মতো রাষ্ট্রনায়কের জীবনাবসান কেবল জাপানের জন্য নয়, তার নেতৃত্ব, চিন্তা, দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার বিবেচনায় এটি পুরো বিশ্বের জন্য ক্ষতি। শেখ হাসিনা তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন। সমবেদনা জানান শোকাহত পরিবারের প্রতি।

শিনজো আবেকে গুলির ঘটনায় নিন্দা করেছেন বিশ্বনেতারা। আবের গুলিবিদ্ধ হওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিন্দা প্রকাশের ঝড় ওঠে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেন, শিনজো আবের ওপর হামলার সংবাদে আতঙ্কিত ও দুঃখিত। তাঁর পরিবার ও স্বজনদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করছি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন বলেন, খুবই দুঃসংবাদ। শিনজো আবে, তাঁর পরিবার ও জাপানের জনগণের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করছি। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরগেই ল্যাভরভ বলেন, জানি না এমন হামলার পেছনে কারণ কী থাকতে পারে। জাপানি সহকর্মীদের কাছে এ ঘটনার নিন্দা করেছি। আশা করি, এ ঘটনার তদন্ত হবে। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন বলেন, জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের ঘটনা শুনে খুব মর্মাহত হয়েছি। আমি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথম যে নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছি আবে তাদের অন্যতম। আবে তাঁর দায়িত্বের প্রতি ভীষণ সচেতন ছিলেন। তিনি উদার ও দয়ালু ছিলেন। আমি আবের স্ত্রী ও জাপানের জনগণের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করছি। এ ঘটনা আমাদের সবাইকে মর্মাহত করেছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ বলেন, জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের গুলিবিদ্ধ হওয়ার দুঃখজনক সংবাদ পেলাম। এই দুঃসময়ে তাঁর পরিবার ও জাপানের জনগণের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করছি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘প্রিয় বন্ধু আবের ওপর হামলার সংবাদে খুবই মর্মাহত। তাঁর জন্য, তাঁর পরিবার ও জাপানের জনগণের জন্য প্রার্থনা রইল।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শিনজো আবে ছিলেন জাপানের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর শাসনামলে জাপানে যেমন অনেক যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে, তেমনি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও জাপান এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। তাঁর নেতৃত্বে জাপানের প্রাচ্যনীতি অনেক শক্তিশালী হয়েছে।
এ সময় বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক সর্বোচ্চ সৌহার্দ্যপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছায়। ঢাকায় মেট্রো রেল, কক্সবাজারে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ হাব ও গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্পসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। সংগত কারণেই প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেকে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

জাপানে সন্ত্রাসী ঘটনা খুবই বিরল। ব্যক্তিগত বন্দুক সংগ্রহে রয়েছে সর্বোচ্চ কড়াকড়ি। তা সত্ত্বেও গত শুক্রবার জাপানেরই একটি শহরে প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আবে ওই সময় জাপানের নারা শহরে ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) এক নির্বাচনী সভায় বক্তব্য দিচ্ছিলেন। পর পর দুটি গুলি তাঁকে বিদীর্ণ করে। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুসংবাদ শুধু জাপান নয়, সারা বিশ্বকে শোকস্তব্ধ করে দেয়। পৃথিবীর প্রায় সব বড় নেতা তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের মৃত্যুতে গভীর শোক ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বাংলাদেশে এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হয়।


সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের জন্ম ১৯৫৪ সালে এক সম্ভ্রান্ত রাজনৈতিক পরিবারে। তাঁর বাবা শিনতারো আবে একসময় জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। একসময়ের প্রধানমন্ত্রী নোবুসুকে কিশির দৌহিত্র শিনজো আবে পড়াশোনা করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে। ঐতিহ্য ও শিক্ষার মিলিত প্রভাব লক্ষ করা যায় তাঁর রাজনীতিতে। তিনি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন ২০০৬ সালে। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে বছরখানেক পরই তিনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। তাঁর অবর্তমানে ১৯৫৫ সালের পর দ্বিতীয় দফায় ২০০৯ সালে এলডিপি ক্ষমতা হারায়। দীর্ঘ চিকিৎসার পর তিনি পুনরায় রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং ২০১২ সালে দলকে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরাতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। এরপর ২০২০ সালের আগস্ট পর্যন্ত টানা ক্ষমতায় থেকে তিনি রেকর্ড সৃষ্টি করেন। এই সময়ে তিনি দেশে ও বিদেশে জাপানের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে নানামুখী পদক্ষেপ নেন, যাকে ‘আবেনোমিকস’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তিনি জাপানের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জাপানের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য সংবিধান সংশোধনেরও উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পাশ্চাত্যের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করার পাশাপাশি পাশ্চাত্যবিরোধী শিবিরের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন।
শিনজো আবের মৃত্যু শুধু জাপান নয়, সারা বিশ্বের জন্যই এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর মৃত্যুতে গণতন্ত্র, মানবতা বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছে। আমরা আশা করি তাঁর হত্যাকাণ্ডের পেছনের সব রহস্য সঠিক সময়ে উদঘাটিত হবে।
লেখক: কলামিস্ট ও রাজনীতিবিদ, কো-চেয়ারম্যান জাতীয় পার্টি।

 

Posted ১২:২৩ অপরাহ্ণ | বুধবার, ১৩ জুলাই ২০২২

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

Archive Calendar

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।

হেল্প লাইনঃ ০১৭১২১৭০৭৭১

E-mail: [email protected] | [email protected]