• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    উন্নয়ন

    সমুদ্রে অফুরন্ত সম্ভাবনা

    হেলেনা জাহাঙ্গীর | ০৬ এপ্রিল ২০১৭ | ২:৫৭ অপরাহ্ণ

    সমুদ্রে অফুরন্ত সম্ভাবনা

    স্থলভাগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশের জলভাগও। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশের অর্থনীতি মূলত তার জলভাগের অর্থনৈতিক কর্মকা-ের ওপরই নির্ভরশীল। এতদিন সীমানা বিরোধের কারণে বঙ্গোপসাগরে অর্থনৈতিক কর্মকা- চালাতে পারত না বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বিগত সরকারের প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে সীমানা বিরোধের অবসান হয়েছে। এক বিশাল অঞ্চলজুড়ে (স্থলভাগের প্রায় ৮০ শতাংশ) বাংলাদেশের একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই অঞ্চলে বাংলাদেশ তার সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকা- চালাতে পারবে। কিন্তু সে কাজটি খুব সহজ নয়। জলভাগে অর্থনৈতিক কর্মকা- চালানোর জন্য আর্থিক ও


    কারিগরি ক্ষেত্রে যে ব্যাপক প্রস্তুতি থাকা দরকার ছিল, তার প্রায় কিছুই ছিল না বাংলাদেশের। এখন সেই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আশা করা যায়, শিগগিরই বাংলাদেশের অর্থনীতি সাগরে থাকা বিপুল সম্পদকে কাজে লাগাতে সক্ষম হবে।


    বঙ্গোপসাগরের প্রাথমিক সম্পদ হচ্ছে মাছ। কিছুদিন আগে পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ জলসীমায় পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মৎস্য শিকারিরা এসে মাছ ধরে নিয়ে যেত। এখন তা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। কারণ তারা জেনে গেছে, বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকে নির্বিঘেœ ফিরে যাওয়া যাবে না। চৌকস কোস্টগার্ডের হাতে আটক হতে হবে। সেটি কিভাবে সম্ভব হলো? কোস্টগার্ডের জনবল বাড়ানো হয়েছে এবং পাহারা দেওয়ার জন্য বেশ কিছু অত্যাধুুনিক জাহাজ নামানো হয়েছে। আরো বেশ কিছু জাহাজ সাগরে নামার অপেক্ষায় রয়েছে। নৌবাহিনীতে দুটি সাবমেরিন যুক্ত হয়েছে। ফলে সমুদ্রসীমা রক্ষায় ক্ষমতার দিক থেকে আগে যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল বিশ্বে ১৩৭তম, এখন তা উঠে এসেছে ৪৬তম অবস্থানে। গ্যাস, খনিজসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের জন্য উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। এর মধ্যেই বেশ কয়েকটি ব্লকে গ্যাস আহরণের জন্য বিদেশি কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিও হয়েছে। আশা করা যায়,

    ২০২৫ সালের আগেই সমুদ্রের গ্যাসও বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করা যাবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব অনুসন্ধান ও উত্তোলনের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চলছে। এসবই আমাদের আশান্বিত করে। সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখায়।

    বাংলাদেশ দুনিয়ার অন্যতম ঘনবসতি দেশ। গত চার দশকে বর্ধিত জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে বসতবাড়ি, স্কুল-কলেজ, রাস্তাঘাট, শিল্প-কলকারখানাসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে কৃষিজমি ব্যবহৃত হওয়ায় তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। দেশে এখন চাষযোগ্য জমির অপ্রতুলতা যেমন দেখা দিচ্ছে তেমন শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া যাচ্ছে না।

    সাগরপারের জমি উদ্ধার সম্ভব হলে এ সংকট থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাওয়া যাবে। সাগরপারে নিঝুম দ্বীপের আশপাশের জমি উদ্ধার করে বনায়ন এবং পর্যটন জোন গড়ে তোলা হলে পর্যটন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া অবস্থার অবসান ঘটানো সম্ভব। উদ্ধারকৃত জমিতে বনায়ন করা হলে ভূমিক্ষয় যেমন রোধ করা সম্ভব হবে, তেমনি উপকূলবর্তী এলাকা ঘূর্ণিঝড় ও টর্নেডোর আঘাত থেকে রক্ষা পাবে।

    আরেকটি বিষয় হলো, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে বাংলাদেশের দাবিই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রজয়ে বাংলাদেশ ন্যায্যতার ভিত্তিতে ২০০ নটিক্যাল মাইল অর্থনৈতিক এলাকা ও তদূর্ধ্ব মহীসোপান এলাকা এবং ভারতের সঙ্গে সমুদ্রজয়ে বিরোধপূর্ণ ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটারের সমুদ্রসীমা বাংলাদেশের সঙ্গে যোগ হয়েছে।

    বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় অবস্থিত গ্যাস ব্লকগুলোতে ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার গ্যাস ব্লকের ১০টি ভারত ও ১৮টি মিয়ানমার দাবি করে আসছিল। এসব ব্লকে বিভিন্ন সময় দেশের পক্ষ থেকে অনুসন্ধান চালাতে গেলেও সম্ভব হয়নি। ভারত ও মিয়ানমারের বাধার কারণে ফিরে আসতে হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আদালতের সমুদ্রবিষয়ক রায়ে এ বাধার অবসান ঘটেছে।

    ভারতের সঙ্গে আটটি ও মিয়ানমারের সঙ্গে ১৩টি তেল-গ্যাস ব্লক জিতেছে বাংলাদেশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্জিত সমুদ্রসীমায় আনুমানিক ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) আর ভূ-সীমায় মজুদ রয়েছে ১২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বর্তমানে প্রতিবছর দেশে এক টিসিএফ গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। সে হিসেবে আগামী ১২ বছর পর দেশে গ্যাসের সংকট দেখা দেবে। সমুদ্রসীমায় গ্যাস আবিষ্কৃত হলে এ সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

    বাংলাদেশে সমুদ্র অর্থনীতির ধারণা বাস্তবায়নে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বিমান ও পর্যটনবিষয়ক মন্ত্রণালয় সহযোগিতা কাঠামো প্রস্তুতকরণে যৌথভাবে কাজ করছে। প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হওয়ায় সামুদ্রিক মানচিত্র প্রণয়নের পাশাপাশি সম্পদ আহরণ ও সমুদ্র এলাকার নিরাপত্তার বিষয়টিকে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে কীভাবে সমুদ্রসম্পদ যথাযথ কাজে লাগানো হবে সে বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের এ অঞ্চলে প্রাণিজসম্পদের পাশাপাশি গ্যাস, হাইড্রিড, জিরকন, ইলেমেনাইট, ম্যাগনেটাইটসহ বিভিন্ন মূল্যবান খনিজ সম্পদের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারত বঙ্গোপসাগরে নিজ নিজ সীমানায় এ ধরনের খনিজসম্পদের সন্ধান পেয়েছে। এ কারণে ওই দেশগুলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সমুদ্রসম্পদেও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা নিজ খরচে কিংবা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে সমুদ্রসম্পদ আহরণ করছে। ভারত তার জাতীয় বাজেটে ২শ’ কোটিরও বেশি রুপি সমুদ্রসম্পদ আহরণে বরাদ্দ রেখেছে। আর মিয়ানমার চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তার সমুদ্রসীমার মধ্যে থাকা সম্পদ আহরণে কাজ করছে।

    শুধুই ভারত আর মিয়ানমারই নয়, বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। নতুনভাবে উদ্ধারকৃত সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমুদ্রসম্পদ রক্ষায় বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাস ও মৎস্যসম্পদ রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে।

    সাগরে অর্থনৈতিক কর্মকা- চালানোর জন্য আমাদের শুধু অর্থ বা প্রযুক্তির অভাব নয়, দক্ষ জনবলেরও অভাব রয়েছে। সাগরে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার পরিপূর্ণ সুফল পেতে দক্ষ জনবল সৃষ্টির ওপর আমাদের সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। আর এ কাজটি করতে হবে অত্যন্ত পরিকল্পিত ও দ্রুততার সঙ্গে। প্রয়োজনে আমাদের জনবলকে সমুদ্রসম্পদ আহরণে দক্ষ দেশগুলোতে পাঠিয়ে এ কাজে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন ও প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে। আশা করি সরকার এ ব্যাপারে আন্তরিক হবে। এটাই জাতির প্রত্যাশা।

    লেখক : চেয়ারম্যান, জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন

    Facebook Comments

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    webnewsdesign.com

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4669