শনিবার ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সাইমন ড্রিং :হে বন্ধু বিদায়

ডেস্ক রিপোর্ট   |   রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১ | প্রিন্ট  

সাইমন ড্রিং :হে বন্ধু বিদায়

বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানি সৈন্যদের নির্বিচার গণহত্যা শুরুর প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক সাইমন ড্রিং মৃত্যুবরণ করলেন। সাইমন একাধারে ছিলেন বিশ্বখ্যাত সাংবাদিক, একই সঙ্গে খ্যাতিমান টিভি উপস্থাপক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা। মুক্তিযুদ্ধের সময় সাইমনের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেনি, যদিও গেরিলা যুদ্ধে যুক্ত থেকেও রণাঙ্গনের সাংবাদিকতা করার সুযোগ ঘটেছিল আমার। তার সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা ঘটে অনেক পরে, যখন দেশের প্রথম বেসরকারি একুশে টেলিভিশন গড়ে তোলার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন, নব্বই দশকের শেষ প্রান্তে। আমি তখন জাতীয় সংবাদ সংস্থা বাসস-এর প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করি বলে ইটিভি ও বাসস অফিসে কথা হয় অনেকবারই। শিল্পী শাহাবুদ্দিনের আমন্ত্রণে তার কলাবাগানের বাড়িতেও আড্ডা বসে।

সাইমন ড্রিং নামটি বাংলাদেশের রক্তাক্ত জন্ম-ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে। কারণ ঢাকায় নিরস্ত্র বাঙালি জনতার ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যার সাক্ষী ছিলেন এবং সে খবর সবিস্তারে তিনিই বিশ্ববাসীর সামনে প্রথম তুলে ধরেছিলেন। কাজেই জাতি হিসেবে এই সাংবাদিক আমাদের কৃতজ্ঞতার পাশে আবদ্ধ করেছেন।


১৯৭১-এর মার্চ মাসের প্রবল উত্তেজক সময়ে লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফের তরুণ সাংবাদিক সাইমন ছিলেন কম্বোডিয়ায়। পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ায় তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়। তারপর থেকে ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণসহ প্রতিটি বড় ঘটনার ওপর তিনি রিপোর্ট ছাপতে থাকেন ডেইলি টেলিগ্রাফে। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর পরিকল্পিত গণহত্যা শুরুর আগে সামরিক কর্তৃপক্ষ ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থানরত বিদেশি সাংবাদিককে দেশ থেকে বহিস্কার করে। এমনকি তাদের সবাইকে হোটেল থেকে ধরে-বেঁধে এয়ারপোর্টে নিয়ে জোর করে প্লেনে তুলে দেয়। সামরিক বাহিনী চায়নি কয়েক ঘণ্টা পর যে হত্যাযজ্ঞ শুরু হবে, তার কোনো খবর বিশ্ববাসী জানতে পারুক। হোটেলের ছাদের এক কোণে জীবন বাজি রেখে লুকিয়ে থাকেন সাইমন। একইভাবে থাকেন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এপির ফটোগ্রাফার মাইকেল লোঁরা। ২৭ মার্চ কারফিউ উঠে গেলে সব বিপদ উপেক্ষা করে তারা দু’জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য এলাকায়, যেখানে উন্মত্ত সৈন্যরা ২৫ ও ২৬ মার্চ নির্বিচার আগুন দিয়েছে, গণহত্যা চালিয়েছে তার ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করেন। এই দু’জন এরপর সেনাবাহিনীর তল্লাশি ও জেরার মুখে ঢাকা থেকে ব্যাঙ্কক পৌঁছেন। সাইমন পরে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট লেখেন তার পত্রিকার জন্য, যা ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’-এ প্রকাশিত হয় ৩০ মার্চ ১৯৭১।

পশ্চিমা দেশীয় সাংবাদিকদের মধ্যে যারা বাংলাদেশের শরণার্থী সংকটসহ মুক্তিযুদ্ধের কর্মকাণ্ড নিয়ে সরাসরি রিপোর্ট করেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন সাইমন ড্রিং, সিডনি শনবার্গ, মার্ক টালি, ডেন কগিন, কলিন স্মিথ, পিটার হেজেলহার্স্ট, টনি ক্লিফটন, মাইকেল লোঁরা, আরনল্ড জেটলিন, সিরিল জন, মিশেল রবার্ট, লুই হেরেন, নিকোলাস টমালিন, ডিটার আর কান ও পিটার আর হেনরিস।


‘টাইম’ ম্যাগাজিনের ডেন কগিনকে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানের সৈন্যরা জোর করে দেশ থেকে বের করে দেয়। এরপর তিনি পুনরায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেন, মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন প্রতিরোধ সংগ্রামের ওপর প্রতিবেদন লেখেন। তার লেখা ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের ১৯ এপ্রিল ১৯৭১-এর ‘দ্য ব্যাটল অব কুষ্টিয়া’ প্রতিবেদনটি ছিল সাড়া জাগানো। এ ছাড়াও অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসের সাহসী ভূমিকার কথা সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করতে হবে। এই পাকিস্তানি সাংবাদিক করাচির ‘মর্নিং নিউজ’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক ছিলেন। সামরিক সরকার পাকিস্তানের আটজন সাংবাদিককে তাদের পক্ষে লেখার জন্য এপ্রিল মাসে এক সফরে ঢাকায় নিয়ে আসে। সরেজমিন পর্যবেক্ষণের পর ম্যাসকারেনহাস বিবেকের দংশনে ভুগতে থাকেন এবং একসময় পালিয়ে লন্ডনে চলে যান। কাজটা তার ব্যক্তিজীবনের এক বড় বিপ্লব ছিল সন্দেহ নেই। কারণ তার গোটা পরিবার তখন করাচিতে। লন্ডনে পৌঁছে তিনি ‘সানডে টাইমস’ পত্রিকার সম্পাদক হেরাল্ড ইভান্সের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ‘জেনোসাইড’ শিরোনামে ‘সানডে টাইমস’-এর ১৩ জুন ১৯৭১ সংখ্যায় বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, যা বিশ্ব বিবেক নাড়িয়ে দেয়।

Facebook Comments Box

Posted ১২:৫৯ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০