বৃহস্পতিবার, জুলাই ৮, ২০২১

সামাজিক অপরাধের হতাশাজনক চিত্র

ডেস্ক রিপোর্ট   |   বৃহস্পতিবার, ০৮ জুলাই ২০২১ | প্রিন্ট  

সামাজিক অপরাধের হতাশাজনক চিত্র

বিশ্বব্যাপী করোনা অতিমারির নতুন প্রকরণ ভারতে উদ্ভূত ডেলটা ভ্যারিয়েন্টের প্রাদুর্ভাব-বিস্তার-প্রাণ সংহারের দুঃসহ ও নির্দয় দৃশ্য মানবজাতির হৃদয়ে নিগূঢ় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা গভীর থেকে গভীরতম হতে চলেছে। ৫ জুলাই সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, বিগত ১৫ দিনে শুধু চট্টগ্রামেই রোগীর সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে এবং সংক্রমণের চেয়ে অধিক মাত্রায় আগ্রাসী রূপ ধারণ করলে শয্যাসহ নানা সরঞ্জামের ভয়াবহ সংকট পরিলক্ষিত হবে। ‘জীবন সর্বাগ্রে’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উচ্চারিত প্রতিপাদ্যকে পরিপূর্ণ বিবেচনায় জীবন-জীবিকার সমান্তরাল সচলতা নিশ্চিতকরণে উদাসীনতার নিরঙ্কুশ পরিহারে সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।

দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে, এই কঠিন ক্রান্তিকালেও কতিপয় মানবরূপী দানবের জীবনমোহকে প্রভাবিত করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। অর্থ-ক্ষমতা-আধিপত্য-ঘুষ-দুর্নীতি-প্রতারণা-কদাচার-মিথ্যাচার ইত্যাদির দুর্বৃত্তায়নে নিমজ্জিত হিংস্র নাগ-নাগিনীর উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তুলছে। হত্যা-আত্মহত্যা-ধর্ষণ-ভূমিদস্যুতা-কিশোর ও টিকটক অপরাধসহ সম্প্রতি সংঘটিত নানামুখী নৃশংস অপরাধের দৃশ্যপট আদিম বর্বরতাকেও যেন হার মানিয়েছে। করোনা অতিমারির চেয়েও অধিকতর বিপর্যস্ত ও বিপদসংকুল এসব সমাজবিধ্বংসী কর্মযজ্ঞ অতিশয় দুরাশার দেয়াল নির্মাণ করে চলছে। ১৩ মার্চ সংবাদমাধ্যম সূত্রমতে, করোনাকালীন এক বছরে সারাদেশে ১৪ হাজার ৪৩৬ নারী ও পুরুষ আত্মহত্যা করেছে। পুরুষের বিপরীতে আত্মহত্যাকারী নারীর আধিক্য সত্যিই বেদনাদায়ক। সূত্রমতে ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে এর হার ৪৪.৩৬ শতাংশ বেড়েছে। পারিবারিক জটিলতা, সম্পর্কের অবনতি, হতাশা এবং আর্থিক সংকট আত্মহত্যার মূল কারণ। শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যা প্রবণতার প্রধান নিয়ামক হচ্ছে মানসিক অস্থিরতা। বিশেষ করে করোনাকালে সরাসরি শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধের দীর্ঘসূত্রতা, ঝরে পড়ার প্রবণতা, ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গঠনে অনিশ্চয়তা, বয়স বৃদ্ধির কারণে কর্মসংস্থানসহ সার্বিক বিষয়ে পিছিয়ে পড়ার অদৃশ্য-অজানা আশঙ্কা এবং ক্ষেত্রবিশেষে একাকিত্বের হতাশা আত্মহননের পথকে প্রশস্ত করছে বলে অনেকের ধারণা। যদিও সংক্রমণ বিস্তার রোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা মোটেও অযৌক্তিক নয়, সমস্যা নিরসন ও আরোপিত বিধি-নিষেধগুলোর যথার্থ প্রতিপালন, অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে গৃহীত ব্যবস্থার যথার্থ বাস্তবায়নে সার্বিক সাফল্যের দৃশ্যমান অর্জন সন্তোষজনক মনে হচ্ছে না।


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপেও এমন চিত্রের পরিত্রাণে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দ্বারা চিকিৎসা, অতিমাত্রায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়া বিষয়গুলোর ব্যাপারে মনোযোগ দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মনোবিজ্ঞানী ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞের মতানুসারে- সামাজিক বৈষম্য, পারিবারিক কলহ, মাদক, ইন্টারনেটের অপব্যবহার, সন্তানের প্রতি অভিভাবকদের উদাসীনতা, পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়া, নৈতিক স্খলন, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার, ব্ল্যাকমেইলিং ইত্যাদি আত্মহত্যার মতো জঘন্য অপরাধের দিকে মানুষকে ধাবিত করেছে। জীবনের অবমূল্যায়ন, চাকরি চলে যাওয়া, বেতন কমে যাওয়া, সন্তান স্কুলে না যাওয়ার কারণে মানুষ হতাশা ও বিষণ্ণতায় ভুগছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, মানুষ বুদ্ধি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। সামাজিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক, অনৈতিক সম্পর্কের সমস্যা, যৌতুক- এসব কারণে দেশে আত্মহত্যার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকে পরিকল্পনা করেও আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।

১ জুলাই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদনে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে ৭৬৭ জন নারী ধর্ষিত হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৪ জনকে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয় এবং আত্মহত্যা করেছে পাঁচজন। উল্লিখিত সময়ে ৭২২ শিশুর শারীরিক ও যৌন নির্যাতন এবং ৩১৭ শিশুকে হত্যাসহ মোট এক হাজার ৩৯ শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। উল্লিখিত নির্যাতিত শিশুর মধ্যে ধর্ষিত হয় ৪২০, আত্মহত্যা করে ৫১, যৌন নির্যাতিত হয় ৫০ জন ছেলে শিশু এবং উত্ত্যক্তকরণ, গৃহকর্মী নির্যাতন, শিক্ষকের কাছে নির্যাতনসহ নানা নির্যাতনের শিকার হয়েছে আরও ২০৯ শিশু। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এই সময়ে নির্যাতিত ৭৬৭ নারীর মধ্যে ৬১১ জন একক ও ১৫৬ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণে নির্যাতিত হয় এবং ১৬৬টি ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়। যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ৫৭ জন পুরুষ এবং হত্যা করা হয় চারজন পুরুষ ও দু’জন নারীকে। এই সময়ে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হওয়া ৩৫০ নারীর মধ্যে স্বামী, স্বামীর পরিবার এবং নিজ পরিবার দ্বারা নিহত হয় ২১০ জন ও আত্মহত্যা করেছে ৭৮ জন নারী। এ ছাড়া যৌতুককে কেন্দ্র করে নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডে মৃত্যুবরণ করেছে ১২১ নারী। যৌতুকের জন্য নির্যাতন করে হত্যার সংখ্য ৪১ জন, নির্যাতিত হয়ে আত্মহত্যা করেছে ৯ জন এবং শারীরিক নির্যাতনে নিবর্তিত হন ৭১ নারী। বিগত মাসে প্রকাশিত উল্লেখ্য সংস্থার অন্য প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে সারাদেশে ধর্ষণের শিকার, স্বামীর হাতে খুন ও দাম্পত্য কলহের জেরে আত্মহত্যা করে যথাক্রমে এক হাজার ৪১৩ জন, ৯৫ জন ও ৫৬ জন নারী, যা ২০২০ সালে এসে দাঁড়ায় যথাক্রমে এক হাজার ৬২৭, ২৪০ ও ৯০ জনে। ২০২১ সালের প্রথম পাঁচ মাসে ৬০১ জন নারী ধর্ষিত হয়েছে, ২১৮ জন নারী স্বামীর হাতে খুন হয়েছে এবং দাম্পত্য কলহের জেরে আত্মহত্যা করেছে ৬০ নারী। ধর্ষিত নারীর মধ্যে ৫০২ জন একক ও ৯৯ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে ২২ জন এবং আত্মহত্যা করেছে পাঁচজন। প্রতিবেদন বিশ্নেষণে দেখা যায়; দাম্পত্য কলহের জেরে যাদের হত্যা করা হয়েছে বা আত্মহত্যা করেছে তাদের ৩৫ শতাংশই ১৯ থেকে ৩০ বছর বয়সী। ১৮ বছরের নিচে ১১ শতাংশ। ধর্ষণের শিকার ২৩ শতাংশই ১৩ থেকে ২৪ বছর বয়সী এবং ১২ বছরের নিচে ১৮ শতাংশ। মতানুসারে অনলাইনেও ৩৬ শতাংশের বেশি মেয়েশিশু বন্ধুদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়।


যুক্তরাষ্ট্রের পরিসংখ্যান সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ’র প্রতিবেদন অনুসারে বিশ্বে ৩৫ শতাংশ নারী জীবনে কোনো না কোনো সময়ে যৌন হয়রানি-শারীরিক লাঞ্ছনা-শ্নীলতাহানি ও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ শতাংশের কম নারীই আইনের দ্বারস্থ হয়েছে আর বিচার পেয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ ভুক্তভোগী। সংস্থাটির মতানুসারে, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের তুলনায় ১৬-১৯ বছর বয়সের কিশোরীরা চার গুণের অধিক ধর্ষণের শিকার হয়। ওই সংস্থার ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি এক লাখ নারীর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৩২ জনের বেশি, বতসোয়ানায় ৯৩ জন, লেসোথোয় ৮৩ জন, সোয়াজিল্যান্ডে ৭৮ জন, বারমুডায় ৬৭ জনের বেশি, সুইডেনে ৬৩ জনের বেশি, সুরিনামে ৪৫ জন, কোস্টারিকায় ৩৭ জন, নিকারাগুয়ায় ৩২ জন, গ্রানাডায় ৩১ জন, বাংলাদেশে প্রায় ১০ জন, জার্মানিতে ৯ জনের বেশি এবং ভারতে ১.৮ জন ধর্ষণের শিকার হয়। ১১৮টি দেশের মধ্যে চালানো এই জরিপে ১৪তম অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশ ৪০তম অবস্থানে। এ ছাড়া উন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া ১২তম, নিউজিল্যান্ড ১৬তম, নরওয়ে ২৪তম, ইসরায়েল ২৬তম, ফ্রান্স ২৭তম ও ফিনল্যান্ড ২৯তম অবস্থানে।

বিজ্ঞজনের মতে, ব্যাপক জৈবিক-সাংস্কৃতিক-শ্রেণিগত ও নগর-গ্রামকেন্দ্রিক বিরাজিত আর্থসামাজিক বৈষম্যের অসম কারণে অনেক দেশে ধর্ষণের হার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সহিংসতার মূলে পুরুষদের জৈবিক তাড়নার চেয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসংগতি প্রণিধানযোগ্য। অনেক ক্ষেত্রে নানামুখী সামাজিক কলঙ্ক মোচনের দায়মুক্তি হিসেবে ধর্ষণের ঘটনা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রকাশ পায় না বা করা হয় না। মূলত সামাজিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিম্ন আয়ের পেশাজীবী নারী, পোশাক শিল্পকর্মী, দরিদ্র, অল্প শিক্ষিত ছাত্রী, গৃহবধূ ও আদিবাসী নারী সবচেয়ে বেশি এ ধরনের পাশবিকতার কেন্দ্রবিন্দু। দেশ ও জাতিকে সামগ্রিক অর্থে কঠোর অন্ধকার গহ্বরে নিপতিত করার আগে চলমান করোনা অতিমারির চেয়েও মারাত্মক উপরোল্লেখিত অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হলে জাতিকে কঠিন মূল্য দিতে হবে, নিঃসন্দেহে তা বলা যায়।

Posted ১২:০৩ পিএম | বৃহস্পতিবার, ০৮ জুলাই ২০২১

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement