• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    স্বাধীনতা সংগ্রামে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক আবুল খায়ের

    মোঃ লুৎফুর রহমান | ২৬ আগস্ট ২০১৭ | ৯:৫৬ অপরাহ্ণ

    স্বাধীনতা সংগ্রামে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক আবুল খায়ের

    ১৯৭১ সাল। সমগ্র লাকসাম তথা বাংলাদেশ তখন গণআন্দোলনে যোগদান করেছে।দেশের মানুষ হানাদার পাক বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হতে চেয়ে যুদ্ধে মেতে উঠেছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে লাকসামের ভুমিকা প্রশংসার দাবীদার। ১৯৭০ সালের গন আন্দোলনের জোয়ারে সমগ্র লাকসাম তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানীরা গ্রামে গঞ্জে একটি মাত্র স্লোগান “জয় বাংলা”। লাকসামে পাক-হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে হয়েছিল। তখন এ আন্দোলনে অন্যান্যর সাথে এগিয়ে এসেছিলেন লাকসামের কামড্যা মজুমদার পাড়ার টগবগে এক তরুন। নাম তার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক আবুল খায়ের।
    কুমিল্লা জেলার অন্তর্গত লাকসাম উপজেলার কামড্যা মজুমদা পাড়া গ্রামে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়েরের জন্ম। তার পিতার নাম এসমত উল্লাহ মাস্টার, মাতার নাম মাজেদা খাতুন। ভাই-বোনদের মধ্যে আবুল খায়ের সবার বড়। জন্ম তারিখ ১৪ আগষ্ট, ১৯৪৭ ইং।
    তিনি লাকসামের পশ্চিমগাঁও হাই স্কুল হতে ষষ্ঠ শ্রেণীতে প্রথম হয়ে লাকসাম স্কুলে গমন এবং লাকসাম স্কুল হতে কৃতিত্বের সাথে এসএসসিতে উত্তীর্ণ হন । লাকসাম নওয়াব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজ থেকে স্ব-সস্মানে আইএ পাশ করেন। সাহিত্য বিভাগে বিএ পাশ করেন। ছোট বেলা থেকে তিনি ছিলেন নম্র-ভদ্র। দেশের প্রতি ছিল তার মমত্ববোধ।
    ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হলে তিনি ভারতে প্রশিক্ষন নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। ১৬ জুলাই ১৯৭১ লাকসাম বাজারে পাকিস্তানী আর রাজাকারদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত সামনের পুলে গ্রেনেডের বিষ্ফোরন ঘটান। তখন পাকিস্তান ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার আল শামছরা আবুল খায়ের এর উপর অতর্কীত হামলা চালায়। নরপিচাশরা বুলেটের আঘাতে এই বীর সেনানীর বুক ক্ষত-বিক্ষত করে। তবু মাথা নত না করে শক্র বাহিনীর সাথে সমান তালে লড়াই করতে করতে এক পর্যায়ে আবুল খায়ের মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। শক্রবাহিনী এই বীর যুদ্ধাকে ধরে লাকসাম শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান শহীদ মিয়ার নিকট নিয়ে যায়। শহীদ মিয়া উনাকে থানায় হস্তান্তর করেন। পরবর্তীতে জানা যায়, পাকিস্তানীরা ওনাকে সিগারেট ফ্যাক্টরিতে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। সেদিন কচি প্রাণের স্পন্দন থেমে গিয়েছিল বেয়নেটের আঘাতে। তবে এ বীর সেনানীর লাশ খুঁজে পাওয়া যায় নি। ’৭১ থেকে ২০১৭ পযর্ন্ত কত মা সন্তান হারিয়ে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসিয়েছেন, কত স্ত্রী-স্বামীর ব্যাথা ধারন করে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। তার কি সঠিক ইতিহাস কেউ কি জানার চেষ্টা করেছে?
    শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের লাকসাম নওয়াব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজে সাধারণ সম্পাদক (জি.এস) নির্বাচন করে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন একজন সু-সাহিত্যিক, সাংবাদিক সাংস্কৃতিক ও নাট্যকার। তার সম্পাদিত পত্রিকার নাম ছিল ‘ডাকাতিয়া’। তিনি ছিলেন ‘দৈনিক পয়গাম’, ‘সাপ্তাহিক আমোদ’ ও ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকার লাকসামস্থ নিজস্ব প্রতিনিধি।
    তার স্বরিচিত লেখা প্রকাশিত হয়েছিল মাসিক মঞ্জরী, ময়নামতি, দৈনিক আজাদ (রবিবারের আসর ৫এই মার্চ ১৯৬৬ইং) পূর্বদেশ (চাঁদের হাট, ১২ এপ্রিল ১৯৬৭ইং) পত্রিকায়।
    তিনি ছিলেন লাকসাম মিতালী সংঘ’র প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক। এছাড়া ছিলেন নিজ এলাকার ‘স্টুডেন্ট ক্লাব’ এর প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক।
    সাংবাদিকতা এর পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন নায়ক। তার স্বরচিত ও পরিচালিত নাটক ‘সংসার’ জুন মাসে ১৭ তারিখে ভাকড্যা প্রাইমারী স্কুলে মঞ্চস্থ হয়। ব্যাবস্থাপনায় ছিলেন তৎকালীন পশ্চিমগাঁও ইউ পি চেয়ারম্যান জনাব মোখলেছুর রহমান ও তৎকালীন মেম্বার পরবর্তীতে চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক। এছাড়া তিনি কলেজ সাংস্কৃতিক সপ্তাহে স্বরচিত গল্পে দ্বিতীয় পুরষ্কার লাভ করেন। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক আবুল খায়ের এর ছোট ভাই ডাক্তার ফয়েজ আহেম্মদ একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বর্তমানে ‘লাকসাম ডেন্টাল’ নামে একটি ক্লিনিক এ চিকিৎসক হিসাবে কর্মরত। এছাড়া তার দুই মামা পৌরসভাস্থ বাতাখালীর পন্ডিত বাড়ীর বাসিন্দা মরহুম ডাক্তার আব্দুল কাদের ও মরহুম ডাঃ আব্দুল আউয়াল সাহেবও সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন।
    শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক আবুল খায়ের এর বর্তমান প্রজন্মে ভাগ্নে ডাঃ মুজিবর রহমান, মাস্টার মাহবুবুর রহমান, প্রভাষক লুৎফুর রহমান, ডাঃ মাসুদুর রহমান, মিজানুর রহমান, আনিছুর রহমান স্বমহিমায় গৌরবান্বিত।
    শহীদ আবুল খায়ের এর স্মৃতির স্বাক্ষী হিসেবে তার নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কামড্যা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের উচ্চ বিদ্যালয়। রয়েছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের সড়ক, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের স্মৃতি পাঠাগার। প্রস্তবনা রযেছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক আবুল খায়ের কলেজ, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের স্মৃতি ফাউন্ডেশন, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের সংঘ সহ একাধিক প্রতিষ্ঠান। প্রত্যাশা থাকবে উনার স্মৃতির উপর দাঁড়িয়ে থাকা এসব প্রতিষ্ঠানে যেন কোন শকুনের নজর না পড়ে। কোন অযোগ্য ব্যক্তির ভিড়ে যেন যোগ্য ব্যাক্তি হারিয়ে না যায়। কারন অযোগ্যদের ভিড়ে যোগ্য কেউ বাদ পড়লে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা’র আত্মা কষ্ট পাবে।
    আমি দেখেছি শহীদ আবুল খায়েরের পিতা মরহুম এসমত উল্লা মাস্টার আর তার মাতা মরহুমা মাজেদা খাতুনের সন্তান হারানোর বুক ফাঁটা আর্তনাদ। দেখেছি তার ছোট ভাই ডাঃ ফয়েজ আহম্মেদ এর চোখে লোনা জল, দেখিছি তার বোন মাহফুজা বেগম, মনোয়ারা বেগমের আত্ম চিৎকার। যখনই ওনাদের মুখ থেকে শহীদ আবুল খায়ের এর গল্প শুনতাম তখনই দেখতাম উনারা আবেগ আপ্লুত হয়ে আঁখি জলে বুক ভাসাতেন। তবে ওনাদের মধ্যে একটি দৃঢ়চেতা ভাব দেখেছি। উনারা গর্ব করে বলতো আমরা শহীদ মুক্তিযোদ্ধার বাবা/মা/ভাই/বোন, উনাদের এ আবেগ আর গর্বের জায়গা যেন আমরা নষ্ট না করি। আসুন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়েরের স্মৃতি ও তার পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নিজেরা সম্মানিত হই।


    লেখক: মোঃলুৎফুর রহমান
    শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের এর ভাগ্নে।
    সাবেক সহ-সভাপতি,জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ।

    ajkerograbani.com

    Facebook Comments

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4755