মঙ্গলবার, জুলাই ৬, ২০২১

স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার অহংকার

ডেস্ক রিপোর্ট   |   মঙ্গলবার, ০৬ জুলাই ২০২১ | প্রিন্ট  

স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার অহংকার

স্বাধীন বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলনের উজ্জ্বলতম অধ্যায় নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করে স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তার ক্ষমতা দখলের পর থেকেই স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। টানা ৯ বছর আন্দোলনের পর এ বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে ওঠা সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের দুর্বার আন্দোলনেই পতন ঘটে স্বৈরশাসক এরশাদের। শতবর্ষী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক অর্জনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার এই অহংকারও।
ইতিহাস অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৯৮২ সালের ২১ নভেম্বর ঢাবির অপরাজেয় বাংলার সামনে গড়ে ওঠে স্বৈরশাসনবিরোধী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। এই পরিষদে অন্তর্ভুক্ত হয় সে সময়ে ঢাবি ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল ১৯টি ছাত্র সংগঠন। এরপর দেশের কমবেশি সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজেও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গড়ে ওঠে। ১৯৮৩ সালের ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাবি শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে ঢাকার রাজপথে স্বৈরশাসনবিরোধী মিছিল বের করে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ।
এ দু’দিনের মিছিলে পুলিশ নির্বিচার গুলি চালালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে প্রথম জীবন দেন পাঁচজন। তারা হচ্ছেন- জাফর, দীপালি সাহা, জয়নাল, কাঞ্চন ও মোজাম্মেল। ছাত্র আন্দোলন দমনের কূটকৌশল হিসেবে এরশাদ ‘নতুন বাংলা ছাত্র সমাজ’ নামে একটি গ্রুপ গড়ে তোলেন, অনেকটা পাকিস্তান আমলের সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের গুণ্ডা বাহিনী ‘এনএসএফ’-এর আদলে। এরপর ১৯৮৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ঢাবি ক্যাম্পাসে স্বৈরাচারবিরোধী মিছিলে গুলি বর্ষণ করে নতুন বাংলা ছাত্র সমাজের ক্যাডাররা। গুলিতে তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতা রাউফুন বসুনিয়া নিহত হন।
এ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। তবে সামরিক জান্তা সরকারের ব্যাপক বল প্রয়োগ এবং জাতীয় রাজনীতির কুশীলবদের বহুমাত্রিক হিসাব-নিকাশের বেড়াজালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও শহীদদের রক্ত মাড়িয়ে স্বৈরশাসন দীর্ঘ করার সুযোগ পান এরশাদ। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে মিছিলে নেমে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন নূর হোসেন।
ধারাবাহিক আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর শিক্ষার্থী জেহাদ পুলিশের গুলিতে নিহত হলে তার মরদেহ সামনে রেখে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে আরও পাঁচটি সংগঠন যুক্ত হয়ে মোট ২৪টি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য। এর পর থেকে নতুন মাত্রা পায় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। প্রতিদিন শত-সহস্র শিক্ষার্থীর মিছিলে উত্তাল ছিল ঢাবি ক্যাম্পাস।
সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের মিছিলে যুক্ত হতে থাকেন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর স্বৈরাচারবিরোধী মিছিলে হামলা চালায় নতুন বাংলা ছাত্র সমাজের ক্যাডাররা। সে হামলায় নিহত হন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম মহাসচিব ডা. শামসুল আলম খান মিলন। এর পর সারাদেশের শহর-বন্দর, এমনকি গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। অবশেষে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন এরশাদ।
নব্বইয়ের আন্দোলনের নেতাদের আক্ষেপ :নব্বইয়ের সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের অন্যতম নেতা ও বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল সমকালকে বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। দীর্ঘ ৯ বছর এই স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতির সামনে মানুষের ন্যায়সংগত অধিকার আদায়ের একটি প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
তিনি বলেন, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন দেখি না। এখন টিএসসিতে সেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নেই। মানুষের পক্ষে কথাও শোনা যায় না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এমন বিশ্ববিদ্যালয় কখনও চাই না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবার ঐতিহ্যের ধারায় ফিরে আসুক, এটাই প্রত্যাশা।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকালে ডাকসুর ভিপি ও বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস হারিয়ে ফেলেছে। সেই গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে হলে আজকের ছাত্র সমাজকে আরেকটি গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করতে হবে।
সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের অপর নেতা ও বর্তমানে সিপিবির (বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি) কেন্দ্রীয় নেতা আসলাম খান বলেন, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়; বাংলাদেশের ইতিহাসে মানুষের ন্যায্য অধিকার এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তবে সেদিনের প্রেক্ষাপট আর আজকের মধ্যে পার্থক্য আছে। সেদিন স্বৈরাচার এরশাদের জনভিত্তি ছিল না। কিন্তু ১৯৯১ সালের পর যারাই যে ধরনের নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের একটা জনভিত্তি আছে। এ কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও নব্বইয়ের মতো কোনো আন্দোলনে একাত্ম হতে পারছে না। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে যখন জাতির ডাক আসবে, এ বিশ্ববিদ্যালয় ঠিকই জেগে উঠবে।
বর্তমান ছাত্রনেতাদের মূল্যায়ন :সাবেক ডাকসু ভিপি ও বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নুর বলেন, স্বৈরাচারবিরোধী যে চেতনা নিয়ে নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল; পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় আসা সরকারগুলো তা জাতীয় জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও এর প্রভাব পড়েছে। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয় নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারেনি।
ডাকসুর সাবেক এজিএস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইন বলেন, গণতান্ত্রিক সংগ্রামের যে লড়াকু ঐতিহ্য রয়েছে, তা এখনও গভীরভাবে ধারণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। নব্বইয়ের আন্দোলনের বড় একটি অঙ্গীকার- মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। সে চেতনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনও জাগ্রত। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ বলেন, বর্তমানে এ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই।
বর্তমান ও সাবেক উপাচার্যের বক্তব্য :উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনবদ্য চরিত্র হলো গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া। এ বিশ্ববিদ্যালয় সে ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। তিনি বলেন, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি রক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আন্দোলনে আত্মদানকারীদের স্মরণে বিভিন্ন স্থানে ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছ। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গান, কবিতা, দলিলে এ আন্দোলনের ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের চেতনাটা ছিল মূলত মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এই চেতনার মূলকথা ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। তবে কখনও কখনও দেখা যায়, কিছু গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জলাঞ্জলি দেয়; এ চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে। এ বিষয়ে আমাদের সদা সতর্ক থাকতে হবে।


Posted ৬:২৪ পিএম | মঙ্গলবার, ০৬ জুলাই ২০২১

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement