• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ

    খালিদ ফেরদৌস | ২৬ অক্টোবর ২০১৮ | ২:১৬ অপরাহ্ণ

    হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ

    গ্রামে ঢুকেছে শীত। প্রায়ই কুয়াশার চাদর মুড়ি দিচ্ছে গ্রাম্য জনপদ। শহরে কড়া নাড়ছে শীতের আগমনী বার্তা। শীতকাল আসলেই খেজুরের রস-গুড়, পিঠা-পায়েশে মনে পড়ে যায় পল্লী মায়ের কোল। পত্রিকা, ম্যাগাজিন, সাময়িকী, টিভি চ্যানেলের প্রতিবেদনে শোভা পায় গাছির (খেজুরের রস উৎপাদনকর্মী) খেজুর গাছ তোলা বা কাটার চিরায়ত ছবি। ফুলেল সরিষা ক্ষেত, শাক-সবজি ক্ষেতের মাঝে, মেঠোপথের ধারে, সারি সারি রসের পাত্রসহ খেজুর গাছের ছবি, গাছির বাকে (বাঁশের তৈরি রস বহনের মাধ্যম) করে রস বয়ে নিয়ে যাবার ছবি তুলতে সবাই ক্ষণিকের জন্য ফটোগ্রাফার হয়ে যায়। রূপসীর বাংলার এই ক্যানভাস দেখলে আপাদমস্তক নগর জীবনের বাসিন্দারও মনটা জুড়িয়ে যায়। শৈশব যাদের গ্রামে তাদের মধ্যে খুব কমই আছে যারা অন্যের খেজুর গাছ থেকে রাতে বন্ধুরা মিলে রস চুরি করে পান করেনি। রস চুরি করাকে কেন্দ্র করে খেজুর গাছের মালিকরাও তেমন আপত্তি তুলত না। এটায় ছিলো বাঙালির হাজার বছরের পুরাতন গ্রামীণ সংস্কৃতির উজ্জ্বলতম উদাহরণ। এখন জনপদের এই সব দারুন দারুন ব্যাপারগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। এই সমস্ত কর্মকাণ্ডের জায়গায় গ্রাম-শহরে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মাদক হানা দিয়েছে। যা শেষ করে দিচ্ছে অনেক সম্ভাবনাময় তরুণদেরকে। জাতীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে দেশ ও বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে সার্বিক উন্নয়ন। এত কিছুর পুরও ভোজনবিলাসীদের কাছে অতি প্রিয় খেজুরের রস ও গুড়ের তৈরি পিঠা-পায়েশ। এক সময় গ্রাম-গঞ্জে জামাই, আত্মীয়-স্বজন আপ্যায়নের প্রধান অনুসঙ্গ ছিলো খেজুর গুড়ের তৈরি বাহারী সব খাবার-দাবার। ডাক্তারী ভাষ্য মতে, খেজুরের রস পেটের পরজীবী ধ্বংস করে এবং বিভিন্ন রোগের এন্টি-বায়োটিক হিসেবে কাজ করে। নগরের বার্গার-স্যান্ডউইচসহ ফাস্টফুডের সংস্কৃতিতেও শীতকাল জুড়ে শহরের পথে-ঘাটে খেজুর গুড়ের ভাবা পিঠা-পুলিসহ নানা ধরনের খাবার পাওয়া যায়। তবে পরিতাপের বিষয়, শীতকাল ব্যতিরেকে নবান্নসহ কিছু ঐতিহ্যবাহী উৎসব ও মেলায় খেজুর গুড়ের পিঠা-পায়েশের দেখা মেলে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে পিঠা-পায়েশ তৈরিতে খেজুরের গুড়ের স্থানে চিনির ব্যবহার করা হয়। যা স্বাদে-গন্ধে খেজুরের গুড়ের তৈরি পিঠা-পায়েশের মত সুস্বাদু নয়।
    বাংলাদেশে খেজুরের রস ও গুড়ের পাশাপাশি খেজুর ফলের অনেক চাহিদা রয়েছে। রমজান মাসে ইফতারির অন্যতম পদ খেজুর। মূলত সারাবছর পণ্যটির চাহিদা না থাকলেও রোজা এলেই এর চাহিদা রহুগুণ বেড়ে যায়। সূত্র বলছে, বছরজুড়ে খেজুরের চাহিদা হয় ২০ হাজার টন। যার ১৮ হাজার টনই লাগে রমজান মাসে। দেশে খেজুরের উল্লেখযোগ্য কোন চাষাবাদ বা উৎপাদন হয় না বলে পুরোটায় নির্ভরশীল আমদানির উপর। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে খেজুর আমদানি করা হয়েছে ৪৩ হাজার ৮৮২ টন। যার মূল্য হাজার কোটি টাকা। ধর্মীয় অনুভূতি এবং নবী কারীম (স.) এর উপর ভক্তি ও শ্রদ্ধার কারণে প্রায় অধিকাংশ রোজাদার খেজুর দিয়ে ইফতার করে। তাই দেশে খেজুরের বাজার মিলিয়ন ডলারের।
    খেজুর গাছ দেশের সোনালী অতীতের একটা উপাদান। বৃহত্তর যশোর অঞ্চলে খেজুর গাছ কেটে ফেলার পরও চোখে পড়ার মত কিছু গাছ অবশিষ্ট রয়েছে। যা থেকে দেশের সিংহভাগ রস-গুড়ের চাহিদা মেটায়। সেখান থেকে প্রচুর বড় বীজওয়ালা খেজুরও উৎপাদন হয়। এর কিয়দ অংশ গ্রাম্য মানুষের রসনাবিলাস মেটায়। কিছু কিছু এলাকায় বাজারে দেশি খেজুর বিক্রি হতেও দেখা যায়। অবশ্য বাইরে থেকে আমদানি করা খেজুরের তুলনায় কম সুস্বাদু হবার কারণে ব্যাপকহারে বাজারজাত করা সম্ভব হয় না। যার দরুন প্রতি বছর অনেক দেশি জাতের খেজুর নষ্ট হয়।
    আমরা জানি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণায় অনেক সমৃদ্ধ এবং সারা বিশ্বে এজন্য আমাদের সুনাম রয়েছে। বিশেষ করে আমাদের কৃষিবিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের নাম বলতেই হয়। যিনি কৃষি গবেষণায় তাঁর খ্যাতি দুনিয়াজোড়া। তিনি ২০০৮ আমেরিকাতে পেঁপের জিনোম সিকোয়েন্স বা জীবন রহস্য আবিষ্কার করে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন। তিনি তাঁর একদল দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বাংলাদেশি গবেষক বর্তমান সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের একান্ত সহযোগিতায় ২০১০ সালের ১৬ জুন পাটের জিনোম সিকোয়েন্স আবিষ্কার করেছেন। যা পাটের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে এবং টেক্সটাইল শিল্পের আমূল পরিবর্তন করে দেবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছে। পাট দিয়ে কাপড় তৈরি করে তা দিয়ে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন সম্ভব হবে। এটা করতে পারলে আমরা দর্জির দেশ একথা আর কেউ বলতে পারবে না।
    প্রসংগক্রমে বলা যায়, বাংলাদেশের বৈদেশিক মূদ্রার ৮০ শতাংশ অর্জনকারী তৈরি পোশাক খাত (আরএমজি) এর অধিকাংশ কাপড় বিদেশ থেকে আমদানী করা হয়। বাংলাদেশের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলো এসব আমদানি করা কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি করে ইউরোপ-আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে।
    যা হোক, ইতোমধ্যে মাকসুদুল আলমের আবিষ্কারের সূত্র ধরে পাট থেকে পরিবেশবান্ধব সবুজ পলিব্যাগ তৈরি হচ্ছে। যা দেশের একটি কোম্পানি ইউরোপিয় ইউনিয়নভূক্ত দেশসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানির কার্যাদেশ পেয়েছে। কৃষি গবেষণায় ধানসহ বিভিন্ন ফসল ও ফলে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। কৃষি গবেষণা, মানুষের নির্মহ চেষ্টা এবং বর্তমান সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ছোট্ট একটি দেশ হয়েও সারাবিশ্বে বাংলাদেশ মাছ উৎপাদনে ৪র্থ। বাংলাদেশ এখন তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে।
    ধান, পাট, পেঁপের মত যদি দেশি জাতের খেজুর নিয়ে গবেষণা করে জিনোম সিকোয়েন্স বা জেনেটিক (বংশগতি) বৈশিষ্ট্যের নীলনকশা আবিষ্কার করা যায় তবে এটির উন্নত জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব হবে। যার ফলে কৃষিখাতের অভাবনীয় সফলতা অর্জিত হবে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের মাধ্যমে যদি দেশি খেজুর উন্নত জাতের খেজুরের মানে উন্নীত করা যায় তবে কোটি কোটি ডলার আমদানি না করা বাবদ সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি দেশের চাহিদাপূরণ করে উদ্বৃত্ত খেজুর বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন করা যাবে। এটির মাধ্যমে এদেশের নিম্নবিত্তের মানুষের মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা নিম্নমানের ময়লা-বালিযুক্ত খেজুর খেতে হবে না। ঘুরে দাঁড়াবে গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতি।
    কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এ ব্যাপারে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ ও কৃষি বিজ্ঞানীদের কোন মাথা ব্যথা নেই। বৃহত্তর যশোর জেলাসহ সারাদেশে খেজুর গাছ উজাড় করে চাষের জমি বের করে অন্য লাভজনক ফসল চাষাবাদ করা হচ্ছে। এমন কী ক্ষতিকর তামাক চাষও করা হচ্ছে বেশি লাভের আশায়। বেআইনীভাবে অনেক ইটভাটার মালিক প্রাকৃতিক কয়লা ব্যবহার না করে জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করছে খেজুর গাছ। বর্তমান কৃষি অর্থনীতি বিবেচনায় নিলে এটা হওয়া অস্বাভাবিক নয় বলে মনে করছে অনেকে। অপর দিকে একটি অসাধুচক্র আখের চিনির সাথে বিভিন্ন কেমিক্যালের মিশ্রণ দিয়ে হুবহু খেজুরের গুড় তৈরি করছে। যা মানব শরীরের জন্য খুব ক্ষতিকর। নীতি বিবর্জিত মানুষের এহেন অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের কারণে খেজুর গাছের ঐতিহ্য ধ্বংসের সাথে সাথে পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনছে।
    তাই গ্রামীণ ঐতিহ্য বাঁচাতে এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রোধ করতে এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা খেজুর গাছগুলোকে রক্ষা করতে হবে। এজন্য সর্বপ্রথম সরকার ও কৃষিবিভাগের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। খেজুর গাছ রক্ষায় পরিবেশবাদী, কৃষিবিদসহ সচেতন মহলকে সোচ্চার হতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষক ও জনগণকে হতে হবে দায়িত্বশীল। কারণ একজন কৃষক ইচ্ছা করলেই ফসলের কোন ক্ষতি না করে খুব সহজে জমির আইল বা সীমানায় খেজুর গাছ রাখতে পারে। বলা প্রয়োজন, দেশি খেজুর বিষয়ে উচ্চতর গবেষণার মাধ্যমে জাত উন্নয়ন সম্ভব হলে মানুষ খেজুর গাছ রক্ষা ও নতুন করে চারা রোপন করে ব্যবসায়িকভাবে চাষে আগ্রহী হবে। তাতে করে কৃষিখাতে খেজুর বিপ্লবসহ দেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে এবং বাঙালির হাজার বছরের খেজুরের রস-গুড়, পিঠা-পুলি, পায়েশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ফিরে পাবে হারানো মহিমা। জাতীয় সংসদ ভবনের উত্তর প্লাজার খেজুর বাগান দেখে মনটা ভরে যায়। তেমনি দেশি খেজুরের জাত উন্নয়নের পর দুবাই, সৌদি, কুয়েতের রাস্তা-ঘাটের মত এদেশের প্রতিটি মহাসড়ক ও রাস্তায় খেজুর গাছ মাথা তুলে দাঁড়াক, উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে এগিয়ে যাক বাংলাদেশ। আশা করি বর্তমানে যে সরকার আছে এবং অদূর ভবিষ্যতে যারাই ক্ষমতায় আসুক না কেন তারা কৃষিবান্ধব মানসিকতার পরিচয় দিয়ে খেজুর গাছ, রস-গুড় ও জাত উন্নয়নে উচ্চতর গবেষণায় সুদৃষ্টি দিবেন।


    লেখক; খালিদ ফেরদৌস, কবি ও গবেষক


    Facebook Comments

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    webnewsdesign.com

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4669