• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা, দেখাবে আলোর পথ

    আর কে চৌধুরী | ০৮ নভেম্বর ২০২০ | ৯:৪৫ অপরাহ্ণ

    হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা, দেখাবে আলোর পথ

    বাংলাদেশে হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য একটি আলাদা মাদ্রাসা চালু হয়েছে। এটি হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য প্রথম মাদ্রাসা। ঢাকার কামরাঙ্গীর চরের লোহার ব্রিজ এলাকায় নির্মিত এ মাদ্রাসাটির নাম ‘দাওয়াতুল কুরআন তৃতীয় লিঙ্গের মাদ্রাসা’। সরকারি হিসাবে দেশে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার হলেও এর পরিমাণ ৫০ হাজারের বেশি।


    আয়োজকরা বলছেন, হিজড়ারা পরিবার ও সমাজে নানাভাবে অবহেলিত, অনাকাক্সিক্ষত এবং অবাঞ্ছিত। তাই এ জনগোষ্ঠীকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর লক্ষ্যে এ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দেশের মূলধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও তাদের পড়ানোর ব্যবস্থা নেই। মাদ্রাসাটিতে শতাধিক শিক্ষার্থী পাঠ নিতে পারবে। এর অর্থায়ন করছে মরহুম আহমেদ ফেরদৌস বারী ফাউন্ডেশন। এর অধ্যক্ষ ও পরিচালক মুফতি আবদুর রহমান আজাদ নিজেও অন্যতম উদ্যোক্তা। অনাবাসিক এ মাদ্রাসায় যে কোনো বয়সী তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ ভর্তি হতে পারবে।


    শুক্রবার মাদ্রাসার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীর চর, লালবাগ, কেরানীগঞ্জ ও বাড্ডার ৪০ জন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ অংশ নেয়।

    মুফতি আজাদ বলেন, এই মাদ্রাসায় প্রথমে হিজড়াদেরকে কুরআন শিক্ষা দেওয়া হবে। এছাড়া কওমি শিক্ষা সিলেবাস অনুসারে নূরানী, নাজেরা, হিফজুল কুরআন ও কিতাব বিভাগ চালু হবে। শুক্রবার থেকেই তাদের ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পরবর্তিতে এখানে হিজড়াদেরকে কারিগরী শিক্ষায় শিক্ষিত করতে অভিজ্ঞদের নিয়ে আরেকটি আলাদা বিভাগ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি। মাদ্রারাসাটিতে ১০ জন প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন বলে জানান এই শিক্ষক।

    হিজড়া জনগোষ্ঠী সমাজে অবহেলিত, নানা বিষয়ে তারা বঞ্চিত। এমনকি তারা কোনো মসজিদে গিয়েও নামাজ পড়তে পারে না। তাদেরকে এখানে কুরআন শিক্ষা দেওয়া হবে। পরবর্তিতে কারিগরী শিক্ষা দেওয়ার বিষয়ে কার্যক্রম শুরু করা হবে। মাদ্রাসার পরিচালক আবদুর রহমান আজাদ বলেন, হিজড়াদের জন্য এই উদ্যোগ প্রথমত মহান আল্লাহকে খুশি করা। দ্বিতীয়ত মানবিক বিবেচনা করে বিবেকের তাড়নায় হিজড়াদের কল্যাণে এই মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর আগে গত ছয় মাস ধরে ঢাকার যেসব এলাকায় হিজড়ারা বসবাস করেন এমন আট জায়গায় গিয়ে তাদের কুরআন শিক্ষা দেওয়া শুরু করা হয় বলে জানান তিনি।

    সংবিধান অনুযায়ী দেশের সব মানুষ সমান। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, বাসস্থান বা পেশাগত কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করা যাবে না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের দেশে হিজড়া জনগোষ্ঠীর লোকজন চরম অবহেলার শিকার। সমাজে তারা প্রতিনিয়ত তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার হয়। নিজ পরিবারেও তারা অচ্ছুত ও অনাদৃত। বাংলাদেশের উত্তরাধিকার আইন এখনো নারী-পুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কারণে তারা সম্পত্তির উত্তরাধিকার হতে পারে না। বেশির ভাগ হিজড়াই কোনো সম্মানজনক জীবিকায় নেই, ভিক্ষা ও চাঁদাবাজিই তাদের মূল পেশা। কেউ কেউ আবার যৌনকর্মকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে।

    সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় হিজড়াদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য বেশ কয়েকটি কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্কুলগামী হিজড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে চার স্তরে উপবৃত্তি প্রদান। ৫০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের অক্ষম ও অসচ্ছল হিজড়াদের বিশেষ ভাতা হিসেবে মাসিক ৬০০ টাকা প্রদান। বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মক্ষম হিজড়া জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বৃদ্ধি ও আয়বর্ধকমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্তকরণ এবং প্রশিক্ষণের পর ১০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, নানা কারণে অনেক হিজড়া সরকারের এই কর্মসূচির সুফল পাচ্ছে না। সব হিজড়া যাতে সরকারের কর্মসূচির আওতায় আসে, তা দেখতে হবে।

    ২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর মন্ত্রিসভার বৈঠকে হিজড়াদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ পরিচয়কে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে এ-সংক্রান্ত নীতিমালা অনুমোদন করা হয়। পরের বছর ভোটার নিবন্ধন বিধিমালা প্রণয়নের সময়ই নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন ফরমে লিঙ্গ পরিচয় হিসেবে হিজড়া যুক্ত করে। তারা বিভিন্ন নির্বাচনেও অংশ নিয়েছে। জানা গেছে, বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি ও উত্তরণ ফাউন্ডেশন দেশে তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছে। উত্তরণ ফাউন্ডেশন হিজড়া ও বেদে জনগোষ্ঠীর জন্য ঘর নির্মাণ, একটি ফ্যাক্টরি ও টেইলার্স করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। আসলে হিজড়ারা আমাদের মতোই রক্ত-মাংসের মানুষ। তবু তারা মানুষের অধিকার থেকে বঞ্চিত। জীবন ধারণের সঠিক দিকনির্দেশনা না থাকায় বেঁচে থাকার তাগিদে তারা অবাঞ্ছিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে ও অনেকের বিরাগভাজন হচ্ছে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ হলে নিশ্চয়ই তারা আলোর পথ দেখবে। হিজড়ারা যদি সার্বিক সহযোগিতা পায় তাহলে তারা দেশের সম্পদে পরিণত হবে। তাদেরকে বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে কাজের সুযোগ দিতে হবে, তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে তারা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে কিছু করতে যাবে না। অপরাধ কমে আসবে।

    মূল সমস্যা হচ্ছে, হিজড়াদের প্রতি সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে হিজড়াদের সম্পর্কে মানুষের মধ্যে যে ভুল ধারণা আছে, তা দূর করতে হবে।

    লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ, সাবেক চেয়ারম্যান রাজউক, উপদেষ্টা, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি আর কে চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, সভাপতি বাংলাদেশ ম্যাচ ম্যানুফ্যাকচারার এসোসিয়েশন, সদস্য এফবিসিসিআই, মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩ নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা।

    Facebook Comments

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩
    ১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
    ২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
    ২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4673