সোমবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২১

১০ বছরে সমুদ্রে গোসলে নেমে ৫২ জনের মৃত্যু

হুমায়ুন কবির:   |   সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১ | প্রিন্ট  

১০ বছরে সমুদ্রে গোসলে নেমে ৫২ জনের মৃত্যু

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে গোসল করতে নেমে গত ১৭ ও ১৮ সেপ্টেম্বর দুইদিনে ৩ পর্যটকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। এতে নড়েচড়ে বসছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। ট্যুরিস্ট পুলিশ, নিরাপত্তাকর্মী ও লাইফগার্ড কর্মীদের কর্ম তৎপরতা আরো বেগবান করা হয়েছে।

পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যে বিরাজ করছে চরম আতঙ্ক। এমনকি স্থানীয় অবিভাবকরা সমুদ্র সৈকতে যাতায়াতে সতর্কতা অবলম্বনে পরামর্শ দিচ্ছেন।


প্রতিদিন পর্যটকরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে সমুদ্র সৈকতে বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে সাগরে নেমে পড়ায় বারবার হতাহতের ঘটনা ঘটছে। সৈকতের নিরাপত্তাকর্মী, ট্যুরিস্ট পুলিশ ও লাইফগার্ড কর্মীদের বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে সাগরে পর্যটকদের একটি অংশ বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে হাঁটুজল থেকে গভীর সাগরে হারিয়ে যাচ্ছে।

অনেক সময় উদ্ধার কর্মীরা তাদের দুর্ঘটনা থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম হচ্ছেন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমও ঘটছে। ফলে প্রতি বছর সমুদ্র সৈকতে গোসল করতে নেমে প্রাণ হারাচ্ছে একাধিক পর্যটক।


কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে সমুদ্র সৈকতে গোসল করতে নেমে ৫২ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে অধিকাংশই যুবক, যুবতী বা শিক্ষার্থী। এমনকি ২০১১ সালে একজন বিদেশি পর্যটকও সৈকতে গোসলে নেমে চোরাবালিতে আটকা পড়ে মারা গিয়েছিলেন। এর তিনদিন পর ওই বিদেশি পর্যটকের লাশ মহেশখালীর ধলঘাটা থেকে উদ্ধার করা হয়।

এদিকে গত ১০ বছরে ইয়াছির লাইফগার্ড ও রবি লাইফগার্ড কর্মীরা সমুদ্রে ভেসে যাওয়া ৭৫৩ জন পর্যটককে মুমূর্ষু অবস্থায় জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। সৈকতের পানিতে নেমে হাঁটুপানির সীমা অতিক্রম করে যখনই পর্যটকরা গভীর সাগরের দিকে চলে যায় তখনই এধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। এ সময় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নিরাপত্তাকর্মী, ইয়াছির ও রবি লাইফগার্ড কর্মীরা হুইসেল বাজিয়ে পর্যটকদের সতর্ক করার চেষ্টা করেও কখনো কখনো ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে দুর্ঘটনা দিনের পর দিন বেড়েই চলছে।

এসব দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন পর্যটকদের সৈকতে নামার পূর্বে লাইফ জ্যাকেট পড়াসহ ১০ নির্দেশনা জারি করেছে।

নির্দেশনাগুলো হলো, সাঁতার না জানলে সমুদ্রের পানিতে নামার সময় লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করতে হবে, লাল পতাকা চিহ্নিত করা পয়েন্টে কোনোভাবে নামা যাবে না, সৈকত এলাকায় সর্বদা লাইফগার্ডের নির্দেশনা মানতে হবে, বিকেল ৫টার পর সমুদ্রে নামা যাবে না, সমুদ্রে নামার আগে জোয়ার-ভাটাসহ আবহাওয়ার বর্তমান অবস্থা জেনে নিতে হবে, লাইফগার্ড নির্দেশিত নির্ধারিত স্থান অন্য কোনো পয়েন্ট থেকে সমুদ্রে নামা যাবে না। এছাড়া সমুদ্রে যেকোনো মুহূর্তে তীব্র স্রোত এবং গুপ্ত গর্ত সৃষ্টি হতে পারে, তাই ভাসমান বস্তু পানিতে নামার আগে বাতাসের গতি সম্পর্কে জেনে নিতে হবে, শিশুদের সৈকতে সব সময় সঙ্গে রাখতে হবে, একা সমুদ্রে নামতে দেওয়া যাবে না এবং অসুস্থ অথবা দুর্বল শরীর নিয়ে সমুদ্রে হাঁটুপানির বেশি নামা যাবে না। এছাড়া সৈকতের গুপ্ত গর্ত ও গণস্রোতপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

এদিকে সমুদ্র স্নানে পর্যটকদের নিরাপত্তায় দুই শিফটে মাত্র ২৭ জন কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। হাজার হাজার পর্যটকের সমুদ্র স্নানে নিরাপত্তায় লাইফগার্ড কর্মীর যেমন রয়েছে স্বল্পতা পাশাপাশি উদ্ধার সরঞ্জামাদির সংকট রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

কক্সবাজার সি সেইফ লাইফ গার্ড সংস্থার প্রকল্প ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, কর্মী ও উদ্ধার সরঞ্জামাদির সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি লাল পতাকা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই কিন্তু নির্দেশনা না মেনে গোসল করতে নামছেন। এক্ষেত্রে পর্যটকদেরও অনেক বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। না হলে দুর্ঘটনা রোধ করা কঠিন।

ফাইল ছবি

সৈকতে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ১০ নির্দেশনাকে কেন্দ্র করে গত শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে এক ক্যাম্পেইনের আয়োজন করা হয়। পানিতে নামার আগে করণীয় সম্পর্কে সচেতনতামূলক ১০ দিনব্যাপী এ ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবু সুফিয়ান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাহিদ ইকবাল, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (মানব সম্পদ) নাসিম আহমেদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) বিভীষণ কান্তি দাশ, জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (পর্যটন সেল) মুরাদ ইসলামসহ ট্যুর অপারেটর, ফায়ার সার্ভিস ও বিভিন্ন সংগঠনের কর্মকর্তারা।

জেলা প্রশাসক ও বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি মো. মামুনুর রশীদ জানান, সৈকতে কর্মরত নিরাপত্তাকর্মী সরকারি-বেসরকারি সবাইকে নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। সমুদ্রের জোয়ারভাটা ও গুপ্তখাল সম্পর্কে আগত পর্যটকদের মাইকিং করে দিক-নির্দেশনা দেওয়ারও আদেশ দেন।

১০ দিনব্যাপী পর্যটক সচেতনতামূলক এই আয়োজন অব্যাহত রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। সৈকতে বেড়াতে আসা শিক্ষার্থী পর্যটক, যুবক ও যুবতী সবাইকে সমুদ্র সৈকতে সাইনবোর্ডে টাঙানো নির্দেশনা ভালোভাবে পড়ে নিয়ে সমুদ্রস্নানের পরামর্শ দেন জেলা প্রশাসক।

Posted ৪:৪৯ পিএম | সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement