বৃহস্পতিবার, জুলাই ৮, ২০২১

১৪ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি, লোকসান ১১০ কোটি!

ডেস্ক রিপোর্ট   |   বৃহস্পতিবার, ০৮ জুলাই ২০২১ | প্রিন্ট  

১৪ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি, লোকসান ১১০ কোটি!

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি সেন্ট্রাল ফার্মা সর্বশেষ নিরীক্ষিত হিসাব বছরে মাত্র ১৪ কোটি টাকার ওষুধ বিক্রি করে। কিন্তু ১৪ কোটি টাকার ওষুধ বিক্রির বিপরীতে নিট লোকসান দেখিয়েছে ১১০ কোটি টাকা। কোম্পানির সর্বশেষ প্রকাশিত নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনেই এ তথ্য রয়েছে।

আয়-ব্যয়ের এমন অস্বাভাবিক হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানান, এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইতে গত জুনে সেন্ট্রাল ফার্মার পর্ষদ সদস্যদের এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালককে কমিশন কার্যালয়ে ডাকা হয়। কোম্পানির এমডি সেখানে দাবি করেন, বিগত বছরগুলোতে নষ্ট হওয়া মজুদ পণ্যকে কাঁচামালের খরচ এবং অনাদায়ী বকেয়া প্রশাসনিক খরচ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ কারণে লোকসানের অঙ্ক এত বড় দেখাচ্ছে।


কমিশন অবশ্য সেন্ট্রাল ফার্মার ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয়। কারণ, এর স্বপক্ষে তাদের কাছে কোনো নথিপত্র নেই। সংস্থাটির সন্দেহ, ২০১৩ সালে আইপিও প্রক্রিয়ায় শেয়ার বিক্রির সময় বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে আয় ও সম্পদ বাড়িয়ে দেখাতে ভুয়া আয় ও মজুদ পণ্য দেখানো হয়েছে। এমনকি এটি প্লেসমেন্ট কারসাজিরও অংশ হতে পারে, যা এত বছর পর তা ঝেড়ে ফেলতে চাইছে।

জানতে চাইলে সেন্ট্রাল ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুনসুর আহমেদ সমকালকে বলেন, ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত পণ্যের কাঁচামাল ক্রয় বাবদ যে খরচ দেখানো হয়েছে, তা ওই হিসাব বছরের নয়। কোম্পানি প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে বিপুল অঙ্কের মজুদ কাঁচামাল ও পণ্য নষ্ট হয়। এত বছর নষ্ট পণ্যকে মজুদ পণ্য হিসেবে দেখানো হচ্ছিল, যা ‘রাইট অব’ (হিসাব থেকে বাদ) করা হয়েছে। এর পরিমাণ ৪৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। তিনি আরও দাবি করেন, যেসব ফার্মেসির কাছে বাকিতে ওষুধ বিক্রি করা হয়েছিল, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যেসব বিক্রয় কর্মীর মাধ্যমে ওষুধ বিক্রি করা হয়েছিল, তাদের অনেকেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। এর ফলে কোম্পানির লোকসানের পরিমাণ ৫৮ কোটি ২২ লাখ টাকা, যা ফেরত পাওয়ার আশা নেই।


সেন্ট্রাল ফার্মার বহির্নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোং গত বছরের ডিসেম্বরে অডিট রিপোর্টে হিসাবের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। নিরীক্ষক তার পর্যবেক্ষণে জানায়, ইনভেন্টরি (মজুদ পণ্য) এবং সেলস রিসিভেবল (বকেয়া) যাচাই করার জন্য কোনো নথিই তাদের দেওয়া হয়নি।

বিএসইসির সংশ্নিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, তৈরি ওষুধ বা কাঁচামাল ইনভেন্টরি হিসেবে থাকলে তা ধ্বংস করতে হলে ভ্যাট নথি দ্বারা সমর্থিত হতে হয় এবং ভ্যাট কর্মকর্তাদের সামনেই ধ্বংস করার নিয়ম রয়েছে। এ নিয়ম মানা হয়েছে, এর প্রমাণ দিতে পারেনি সেন্ট্রাল ফার্মা। ফলে প্রাথমিকভাবে একে জায়িলাতি বলে সন্দেহ হচ্ছে। অধিকতর তদন্ত এবং বিশেষ নিরীক্ষা হলে প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে আসবে।

২০১৩ সালে তালিকাভুক্ত হওয়ার সময় আইপিও প্রসপেক্টাসে সেন্ট্রাল ফার্মা শতাধিক ধরনের ওষুধ তৈরি করে বলে জানায়। কিন্তু চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ ওই সময়ে বিএসইসিতে পাঠানো পর্যবেক্ষণে জানায়, কোম্পানির কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে মাত্র ছয় ধরনের ওষুধ তৈরির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে ব্যাখ্যায় কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সমকালকে বলেন, ‘এটা অনেক বছর আগের কথা। এখন কিছু মনে নেই।’ বাদ দেওয়া ইনভেন্টরি বা বাকিতে বিক্রির তথ্য নথিভুক্ত রয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এগুলোও বহু বছরের, একেবারে প্রতিষ্ঠার পর থেকে। সব তথ্য নেই।’ কীসের ওপর ভিত্তি করে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ‘রাইট অব’ করা হলো- এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি তিনি।

বহির্নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান তাদের পর্যবেক্ষণে আরও জানায়, কর ফাঁকির অভিযোগে সেন্ট্রাল ফার্মার ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ রয়েছে। তারা ব্যবসা পরিচালনা করছে নগদে। এনবিআর ২০১৮ সালের ৪ এপ্রিল পাঠানো এক চিঠিতে সেন্টাল ফার্মার কাছে ২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৪৮ কোটি ৮১ লাখ টাকার কর দাবি করে। ওই দাবি এখনও অনিষ্পত্তি অবস্থায় রয়েছে। সর্বশেষ ৯ কোটি টাকার বেশি কর পরিশোধ না করায় ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়।

সেন্ট্রাল ফার্মা কার্যক্রম শুরু করে ১৯৮০ সালে। এর কারখানা ঢাকার মিরপুরে। সমকালের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঢাকা শহরে সেন্ট্রাল ফার্মার ওষুধ বিক্রি হয় না। এ বিষয়ে কোম্পানির এমডি বলেন, দেশের কোনো শহরেই কোম্পানির ওষুধ বিক্রি হয় না। গ্রাম বা মফস্বলে বিক্রি হয়।

আর্থিক সংকটে পড়ার পর ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে আলিফ গ্রুপের কাছে সব শেয়ার বিক্রি করে দিতে চুক্তি করেন সেন্ট্রাল ফার্মার উদ্যোক্তা পরিচালকরা। এমন ঘোষণার আগেই কোম্পানির শেয়ারদর মাত্র তিন মাসে তিনগুণ হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই শেয়ার কেনাবেচা হয়নি।

Posted ১১:০৪ এএম | বৃহস্পতিবার, ০৮ জুলাই ২০২১

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement