• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    শবেবরাতে পালনীয় আমল

    অগ্রবাণী ডেস্ক | ১১ মে ২০১৭ | ১২:১৪ অপরাহ্ণ

    শবেবরাতে পালনীয় আমল

    শবেবরাত এক পুণ্যময় রজনী। হিজরি বর্ষপঞ্জির অষ্টম মাস শাবানের ১৫তম রাত শবেবরাত নামে আমাদের সমাজে পরিচিত। ‘শব’ আর ‘বরাত’ দুটি শব্দ যোগে রাতটির নামকরণ। শবেবরাত নামকরণ ফার্সি ভাষা অনুকরণে হয়েছে। ‘শব’ শব্দটির অর্থ রাত আর ‘বরাত’ অর্থ ভাগ্য। শবেবরাতের অর্থ ভাগ্যরজনী। এই পুণ্যময় রজনীতে সমগ্র সৃষ্টির আগামী এক বছরের হায়াত, মউত, রিজিক, দৌলত লিপিবদ্ধ হয় এমন বিশ্বাসের ভিত্তিতে উপরোক্ত নামকরণ হয়েছে। রাতটির আরবি নামকরণে বলা হয় ‘লাইলাতুল বারাত’। তবে এ নাম কোনো আরবি পণ্ডিতের দেওয়া নয়, বরং ভারত উপমহাদেশীয় শবেবরাতেরই আরবি অনুবাদ। আরবি ভাষাতে লাইলাতুন অর্থ রাত। আর বারাত অর্থ মুক্তি। অতএব, লাইলাতুল বারাত এর অর্থ মুক্তির রাত। এ রাতের ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে মহান আল্লাহর বিশেষ সান্নিধ্য লাভ এবং গুনাহ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি অর্জন করা যায় এমন বিশ্বাস থেকেই এর নামকরণ লাইলাতুল বারাত করা হয়েছে।


    গুরুত্ব


    মানবজীবনে কোনো কিছুর গুরুত্ব নির্ধারিত হয় তার ফলাফল বা লাভ-লোকসানের ওপর ভিত্তি করে। আর মুমিন বান্দার জীবনে লাভ বলতে পরকালীন জীবনের প্রাপ্তিকেই বিশেষভাবে বোঝায়। আর ক্ষতি বলতে পরকালীন জীবনের বঞ্ছনাকেই বোঝায়। সুতরাং মুমিন ব্যক্তি যে কাজের মাধ্যমে পরকালে জান্নাত লাভ করতে পারে আর জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেতে পারে, সেটাই তার কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ দৃষ্টিকোণ থেকে মুমিন-মুসলমানের জীবনে শবেবরাতের গুরুত্ব সীমাহীন। কারণ, এ রাতের ইবাদতের মাধ্যমে বান্দা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের একান্ত সান্নিধ্য লাভ করতে পারে এবং জাহান্নামের কঠিন শাস্তি থেকে পরিত্রাণ পেতে পারে। হজরত আয়েশা (রা.) একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একবার আমি রাসূলুল্লাহর (সা.)-কে খুঁজতে বের হলাম। জান্নাতুল বাকিতে (মদিনার সর্ববৃহৎ কবরস্থান) গিয়ে তাঁকে পেলাম। তিনি আকাশপানে মাথা উঁচু করে ছিলেন। তিনি আমাকে দেখে বললেন, হে আয়েশা! তুমি কি ভেবেছ, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল তোমার ওপর জুলুম করবেন? হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমি বললাম, তেমন কিছু নয়। আমি ভেবেছিলাম, আপনি হয়তো আপনার অন্য কোনো স্ত্রীর নিকট গমন করেছেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহতায়ালা নিসফে শাবানের রাতে (শবেবরাতে) সৃষ্টির প্রতি করুণার দৃষ্টি দেন এবং কালব গোত্রের বকরির পশমের চেয়েও অধিক মানুষকে ক্ষমা করে দেন। (সুনানে ইবনে মাযা, হাদিস : ১৩৮৯)

    তাৎপর্য

    শবেবরাতের রাতটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ফজিলতপূর্ণ এ রাতে মহান আল্লাহ বান্দার গুনাহ ক্ষমা করেন ঠিকই, কিন্তু নিঃশর্তভাবে নয়। মহান আল্লাহর ক্ষমা পেতে তাকে পাশবিক গুণ বর্জন ও ইমানের দাবি পূরণ করতে হবে। হজরত আবু মুসা আল-আশআরি (রা.) একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা শাবান মাসের মধ্য রজনীতে (শবেবরাতে) সৃষ্টির প্রতি করুণার দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক আর হিংসুক ছাড়া সকলকে ক্ষমা করে দেন। (সুনানে ইবনে মাযা, হাদিস : ১৩৯০)

    শবেবরাতে নেক আমলের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য ও পুণ্য অর্জনের এক মহান সুযোগ আসে মুমিন-মুসলমানের সামনে। বছরের বিরতিতে আগত পর্বটির করণীয় আমল সম্পর্কে স্বাভাবিক কারণেই অনেকে ভ্রমের শিকার হন। তাই এ বিষয়ে আলোকপাত করা জরুরি।

    নামাজ ও রোজা

    ১৫ শাবানের রাতে নফল নামাজ আদায় করা এবং দিনের বেলাতে নফল রোজা রাখার বিষয়ে হজরত আলী (রা.) থেকে একটি প্রসিদ্ধ হাদিস রয়েছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন মধ্য শাবানের রাত আসবে, তোমরা রাতে নফল নামাজ আদায় করবে আর দিনের বেলায় রোজা পালন করবে। কেননা, এ রাতে সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহতায়ালা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন, আছে কি কোনো ক্ষমা প্রার্থনাকারী, আমি তাকে ক্ষমা করে দেবো; আছে কি কোনো রিজিক প্রার্থনাকারী, আমি তাকে রিজিক দান করব; আছে কি কোনো বিপদাপন্ন, আমি তাকে বিপদ থেকে মুক্তি দান করব। এভাবে তিনি সূর্যোদয় পর্যন্ত আহ্বান করতে থাকেন। (ইবনে মাযা, হাদিস : ১৩৮৯)

    শবেবরাতের রাতের নামাজ ও দিনের রোজা উভয়টিই নফল। নফলের নিয়তেই রাখতে হবে। যার যে কয় রাকাত পড়তে ভালো লাগে এবং যিনি যে সূরা দিয়ে পড়তে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তিনি সেভাবেই পড়বেন। তবে অতি অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে যে, সারা রাত নফল নামাজ পড়ে ফজরের ফরজ নামাজ কাজা করলে সারা রাতের ইবাদত কোনো কাজে আসবে না।

    পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত

    শবেবরাতে নফল নামাজ পড়তে পড়তে ক্লান্তি এসে গেলে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করা যেতে পারে। কোরআন তিলাওয়াতকে মহানবী (সা.) সর্বোত্তম জিকির বলে অভিহিত করেছেন। কোরআন তিলাওয়াতের সওয়াবও সীমাহীন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোরআনের একটি হরফ পাঠ করবে, তাকে ১০টি নেকি দান করা হবে। আর প্রতিটি নেকিকে ১০ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হবে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৯১০)

    কবর জিয়ারত

    শবেবরাতে কবর জিয়ারত করা যেতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এ রাতে জান্নাতুল বাকিতে গিয়েছেন বলে হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণিত হাদিসে প্রমাণ পাওয়া যায়। তা ছাড়া কবর জিয়ারত করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি প্রত্যেক জুমার দিন তার পিতা-মাতা উভয়ের অথবা তাদের যেকোনো একজনের কবর জিয়ারত করবে এবং তাদের কাছে দাঁড়িয়ে সূরা ইয়াসীন পাঠ করবে, মহান আল্লাহ তাকে আয়াতের সমপরিমাণ পাপ ক্ষমা করে দেবেন। (তারতীবুল আমানি, হাদিস : ২০০৪)

    দরুদ শরিফ পাঠ করা

    মহিমান্বিত এ রাতে বিশেষভাবে দরুদ শরিফ পাঠ করা যেতে পারে। দরুদ শরিফ পাঠ করা এমনিতেই খুব ফজিলতপূর্ণ একটি আমল। মহান আল্লাহ সূরা আল-আহযাবের ৫৬ নম্বর আয়াতে মুমিনদের নবী করিম (সা.)-এর ওপর দরুদ পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পড়বে, মহান আল্লাহ তার ওপর ১০ বার রহমত বর্ষণ করবেন, তার ১০টি গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন এবং তার ১০টি মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। (আমালুল ইআওমি ওয়াল লাইলাতি, হাদিস : ৩৬৩)

    শবেবরাতের ফজিলত

    শবেবরাত মুমিন বান্দাদের জন্য এক সুমহান সুযোগ এনে দেয়। এ রাত মুমিন বান্দার জন্য নিজের কৃত গুনাহ থেকে মুক্তি লাভের এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে অনন্য মাধ্যম।

    শবেবরাতের ফজিলত সীমাহীন। হজরত আলী ইবনে আবু তালিব (রা.) একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন মধ্য শাবানের রাতটি (শবেবরাত) আসে, তোমরা রাত জেগে নামাজ (নফল) আদায় করো এবং দিনে রোজা রাখ। কেননা, এ রাতে সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে মহান আল্লাহ প্রথম আসমানে নেমে আসেন। আর আহ্বান করতে থকেন, আছো কি কেউ ক্ষমা প্রার্থনাকারী? আমি তাকে ক্ষমা করে দেবো। আছো কি কেউ রিজিক প্রার্থনাকারী? আমি তাকে রিজিক দান করব। আছো কি কেউ আরোগ্য কামনাকারী? আমি তাকে রোগ থেকে আরোগ্য দান করব। এভাবে মহান আল্লাহ সূর্যোদয় পর্যন্ত আহ্বান করতে থাকেন। (সনানে ইবনে মাযা, হাদিস : ১৩৮৮)

    জান্নাত ও জাহান্নাম মহান আল্লাহ মানুষের জন্যই তৈরি করেছেন। মানুষকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে পাপের পঙ্কিল পথ এড়িয়ে পুণ্যের মসৃণ পথে চলতে, জাহান্নামের কঠিন শাস্তি থেকে বেঁচে জান্নাতের পুরস্কার অর্জন করতে। কিন্তু সেটা খুব সহজ ব্যাপার নয়। কারণ, মানুষের নিজের প্রবৃত্তি, পার্থিব মোহ আর শয়তান তার কাঙ্ক্ষিত পথে চলতে বাধার পাহাড় হয়ে দাঁড়ায়। শয়তানকে মহান আল্লাহ যখন অভিশাপ করে জান্নাত থেকে তাড়িয়ে দেন, তখন সে শপথ করে বলেছিল, এরশাদ হয়েছে, ‘যখন তুমি আমাকে তাড়িয়ে দিলে, তখন আমি তাদের জন্য তোমার সিরাতুল মুস্তাকিমের ওপর আড় হয়ে বসে থাকব। অতঃপর আমি তাদের নিকট আসব (ধোঁকা দেবো) সামনের দিক থেকে, পেছনের দিক থেকে এবং ডান দিক থেকে ও বাম দিক থেকে। সুতরাং তুমি তাদের অধিকাংশকেই তোমার কৃতজ্ঞ পাবে না। (সূরা আল-আরাফ : ১৬)

    মানুষের দ্বারা পাপ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পাপের পঙ্কিলতা আর মহান আল্লাহর অবাধ্যতার গ্লানি কাঁধে নিয়ে যাতে মানুষ জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত না হয়, পাপের কালিমা থেকে মুক্ত হয়ে যেন জান্নাতের অধিকার লাভ করতে পারে, সে জন্য মহান আল্লাহর ক্ষমার দ্বার সদা অবারিত।

    এরশাদ হয়েছে, হে নবী! আপনি আমার যে সমস্ত বান্দা নিজেদের ওপর হতাশ (পাপের কারণে) তাদের বলে দিন, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত পাপ মার্জনা করবেন।(সূরা আয্-যুমার : ৫৩) পাপ থেকে মুক্ত হয়ে মহান আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার এক মহান সুযোগ এনে দেয় শবেবরাত।

    তাই রাতটিতে ইবাদত-বন্দেগি আর করুণ ফরিয়াদের মাধ্যমে নিজেকে আল্লাহর দরবারে পেশ করাই মুমিন মুসলমানের কাজ।

    Facebook Comments

    বিষয় :

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4673