মঙ্গলবার ৪ঠা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

আত্মহত্যায় কি সব সমস্যার সমাধান?

রোকাইয়া আক্তার তিথি   |   শনিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২ | প্রিন্ট

আত্মহত্যায় কি সব সমস্যার সমাধান?

শঙ্কাময় অনিশ্চিত জীবনে যেন টিকে থাকাটা দায়, মুক্তি যেন আত্মহননের মাধ্যমে। সব অবসাদ হতাশা পাওয়া না পাওয়ার হিসাব যেন এক নিমিষেই মিলে যায়। এর থেকে আর সহজ উপায় কি আছে? সত্যিই নেই! বর্তমান সময়ে আত্মহত্যা যেন পরিণত হয়েছে নিয়মতান্ত্রিক মৃত্যুর আন্দোলনে। যার মাত্রা বেড়ে চলেছে দিন কে দিন। জীবন জীবিকার তাগিদে বাস্তবতার নির্মম পরিহাসে যুবকের দীর্ঘশ্বাস মুক্তি খোঁজে আত্মহননের নেশায়।
সমসাময়িক পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ধরনগুলোর অন্যতম হচ্ছে আত্মহত্যা। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেশে ও অঞ্চলভেদে ভিন্নরূপ পরিগ্রহ করছে। সমকালীন আত্মহত্যার স্বীকৃত উদাহরণগুলোর মধ্যে উলেস্নখযোগ্য হচ্ছে- প্যাক্ট সুইসাইড, ম্যাস সুইসাইড, প্যারাসুইসাইড, অনার সুইসাইড, ডিউটিফুল সুইসাইড, ইউথানসিয়া, মার্ডার সুইসাইড বা মার্সি কিলিং, সুইসাইড অ্যাটাক ইত্যাদি। দেশের বিজ্ঞজনের প্রচলিত ধারণায় পারিবারিক নির্যাতন, কলহ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, পরীক্ষা ও প্রেমে ব্যর্থতা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, প্রাত্যহিক জীবনে অস্থিরতা, নৈতিক অবক্ষয়, মাদক ইত্যাদি কারণে মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আত্মহত্যার উপর পরিচালিত বিভিন্ন গবষেণায় প্রমাণিত-পৃথিবীর সব আত্মহত্যার পেছনেই রয়েছে আত্মহত্যাকালীন ব্যক্তির বিষণœতা, ব্যক্তিত্বের বিকার, সিজোফ্রেনিয়া, মুড ডিসঅর্ডার, মাদকাসক্তি ইত্যাদি মানসিক রোগ। প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় এ রোগগুলোর প্রতি এক ধরনের বদনাম জড়িয়ে থাকায় সংকোচের কারণে মানুষের এসব রোগের চিকিৎসা করতে সচেষ্ট-উৎসাহিত না হওয়াও আত্মহত্যার অন্যতম কারণ। আবার এই সমস্যাগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণেও রয়েছে অবহেলা, সাধারণ বিষয় ভেবে গুরুত্ব না দেওয়ায় বাড়ছে মানসিক বিকারগ্রস্ততা। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এটি তিক্ত হলেও সত্য দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা সুবিধা অপ্রতুল নয়। যা খুবই দুঃখজনক।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে আত্মহত্যা করে ৮ লাখ মানুষ। দৈনিক এ হার ২ হাজার ১৯১ এবং প্রতি লাখে ১৬ জন। গত ৫০ বছরে সারা বিশ্বে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আত্মহত্যার হার বেড়েছে ৬০ শতাংশ। এর মধ্যে বাংলাদেশে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে ২ দশমিক ৬ শতাংশ। প্রতি বছরই এ হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। গণমাধ্যম সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, বিশ্বে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন এবং বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ জন মানুষ আত্মহত্যা করছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে ৬ বছরে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্যমতে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে আত্মহত্যা করেছে ১০ হাজার ৭৪৯ জন। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে দেশে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে যথাক্রমে ১০ হাজার ২৫৬ ও ১১ হাজার। ২০১৯-২০ সময়কালে করোনার সময়ে বাংলাদেশে আত্মহত্যা করেছে ১৪ হাজার ৪৩৬ জন, যাদের মধ্যে ২০-৩৫ বয়সিরাই সবচেয়ে বেশি। স্বাভাবিক সময়ে মেয়েদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি হলেও এ সময়ে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের আত্মহত্যার পরিমাণ ছিল তিন গুণ। ডিএমপি সূত্রে আরও জানা যায়, ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২১ সালের ৩১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় আত্মহত্যাজনিত অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে ২ হাজার ১৬৬টি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে ১১ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেছে।
এরই মাঝে করোনা মহামারিকালীন (২০২১) সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে, যা ৬১.৩৯ শতাংশ বা ৬২ জন।
মেডিকেল কলেজ ও মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে আত্মহত্যার এ সংখ্যাটি ১২, যা মোট আত্মহননকারীর ১১.৮৮ শতাংশ। ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে এ সংখ্যাটি ৪, যা মোট আত্মহত্যাকারীর ৩.৯৬ শতাংশ। অন্যদিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার ২২.৭৭ শতাংশ, যা সংখ্যায় ২৩ জন। এদের মধ্যে পুরুষ শিক্ষার্থীর সংখ্যাটাই বেশি।
করোনার মধ্যে সামাজিক, আর্থিক ও পারিবারিক চাপ বেড়ে যাওয়া পুরুষ শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পেছনে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে বলে সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন। এক বছরে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ওই বছরই বেশি বলে তারা মনে করেন। এছাড়াও ক্যারিয়ারকেন্দ্রিক, সম্পর্কগত জটিলতা, মানসিক চাপের কারণে এই সিদ্ধান্ত নেন অনেকে।
আত্মহত্যার মিছিলে তবে কি রয়েছে সব সমস্যার সমাধান? সব অবসাদের মুক্তি? অবশ্যই না। আত্মহত্যা কখনো কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না। এটি একটি মানসিক ব্যাধি। আত্মহত্যাকে প্রতিরোধ করা সম্ভব। সম্ভব আত্মহত্যার প্রবণতাকে কমিয়ে আনা। আত্মহত্যা প্রতিরোধের লক্ষ্যে ২০০৩ সাল থেকে প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ সংস্থা দিবসটি পালন করে আসছে। এই দিবসটি পালন করতে আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ সংস্থার সাথে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বৈশ্বিক মানসিক স্বাস্থ্য ফেডারেশন এক সঙ্গে কাজ করে। ২০০৩ সাল থেকে দিবসটি পালন করা শুরু হলেও ২০১১ সালে প্রায় ৪০টি দেশ এই দিবসটি উদযাপন করে। ২০০৩ সালে সর্বপ্রথম পালিত হওয়া দিবসে, ১৯৯৯ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এ বিষয়ে নেওয়া কিছু পদক্ষেপেরও আলোকপাত করা হয় যেখানে প্রধান কৌশল নির্ধারণ করা হয়:
আত্মহত্যার প্রবণতা রোধ এবং এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরির জন্য বৈশ্বিক একটি সংস্থার সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন খাতে এ ব্যাপারটি গুরুত্ব দেওয়া। বিভিন্ন দেশের আত্মহত্যা প্রতিরোধের নীতিমালাসমূহ ও পরিকল্পনাসমূহের বিকাশ ঘটানো এবং তাদের দক্ষতাকে শক্তিশালীকরণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে এটি প্রতিরোধে প্রধান বাধা হলো সামাজিক সচেতনতার অভাব ও আত্মহত্যার সচেতনতায় উন্মুক্ত আলোচনার অভাব এবং এ বিষয়ে সঠিক তথ্যের অভাব : আত্মহত্যার সংবেদনশীলতা এবং কিছু দেশে আত্মঘাতী আচরণের অবৈধতার জন্য অনেক সময়ই আত্মহত্যার বিষয়টি সাধারণ মৃত্যু হিসেবেও বিষয় শ্রেণিভুক্ত করা হয়ে থাকে। মূলত আত্মহত্যা প্রতিরোধ ও সচেতনতার লক্ষ্যেই দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে।
কিন্তু বর্তমান সমাজব্যবস্থায় আমরা বিষণœতা, আবেগকে গুরুত্ব না দিয়ে উপহাস করে থাকি, পরিহাস করি অন্যের ব্যর্থতাকে। আমাদের সমাজব্যবস্থা ও আশপাশের লোকজন প্ররোচিত করে একজনকে মৃত্যু পর্যন্ত নিয়ে যেতে। তাহলে দায়ী কি শুধু একার যে আত্মহনন করল? না পুরো ব্যবস্থার যারা পেছন থেকে প্ররোচিত করে আত্মহত্যার পথে ধাবিত করল?
প্রথম থেকে একটি কথা বলে এসেছি আত্মহত্যা কখনো কোনো কিছুর সমাধান হতে পারে না। কিন্তু কলুষিত মনন, পারিপার্শ্বিক অবস্থা যা ধীরে ধীরে একজনকে আত্মাহুতির পথে ধাবিত করে তা প্রতিরোধের উপায়ন্তর কি? সামাজিক জীব হিসেবে আমাদের কি দায়িত্ব নয়, মানসিক চাপে পৃষ্ঠ কোনো ব্যক্তিকে সহানুভূতি প্রদান করা তার প্রতি দৃষ্টিপাত করা? কিন্তু আমরা এসব বিষয়ে অবহেলা অবজ্ঞা প্রকাশ করি।
সাধারণত যারা হতাশায় নিমজ্জিত থাকে তাদের মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়, তারা সাধারণত মনমরা হয়ে থাকে। নিজেদেরকে দোষী ভাবে, প্রচুর নেগেটিভিটি কাজ করে তাদের মাঝে, বিষণœতা যেন নিত্য সঙ্গী, আড়ালে থাকার চেষ্টা করে, আবার বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হতাশামূলক পোস্ট উক্তি প্রদান করে থাকে। যে কোনো কাজ থেকে গুটিয়ে রাখে নিজেদের পছন্দমূলক কাজেও উৎসাহ প্রকাশ না করা।
এসব ক্ষেত্রে প্রধানত পরিবারের সহযোগিতা অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। আমাদের পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি, কথাবার্তা সহমর্মিতার মাধ্যমে। পরিবার পরিজন নিকটস্থ ব্যক্তিবর্গের অনুপ্রেরণামূলক কথা যেন হতে পারে একেকটি অস্ত্র তাই সবার উচিত নিজেদের পরিবারের লোকের নিয়মিত খোঁজ রাখা ও তাকে অনুপ্রাণিত করা যেন সে নিজেকে কখনো ছোট না ভাবে। বন্ধু-বান্ধব এই ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে। আমরা পারি আমাদের পাশে বসে থাকা বন্ধুটির নিয়মিত খোঁজ-খবরের মাধ্যমে তাকে উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে সাধারণ জীবনে ফিরিয়ে আনা। একটি পজিটিভ কথা বা দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই মানসিক অবসাদ দূর করতে সক্ষম। বিষণœতা, মাদকাসক্তি, ব্যক্তিত্বের বিকার, সিজোফ্রেনিয়াসহ সব মানসিক রোগের দ্রম্নত শনাক্ত করা ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। পারিবারিক বন্ধনগুলো দৃঢ় করতে হবে।
যে কোনো ধরনের মানসিক সমস্যা বা আত্মহত্যার ইঙ্গিত পেলে দ্রম্নত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। প্রেসক্রিপশন ব্যতীত যে কোনো প্রকার ঘুমের ওষুধ বিক্রয় না করা। সঠিক ধর্মীয় অনুশাসনের চর্চা পারে মনকে স্থির রাখতে ও আত্মহত্যার মতো মহাপাপ থেকে বিরত থাকতে।
বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে সচেতনতামূলক বার্তা প্রদান করা। সামাজিক ব্যক্তিবর্গের ভাবনাতে পরিবর্তন এনে সহযোগী মনোভাব প্রকাশ করা। আত্মহত্যা প্রতিরোধে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করা।

কলাম লেখক: রোকাইয়া আক্তার তিথি

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১:২৬ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২

ajkerograbani.com |

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০  
সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া
সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭। সম্পাদক কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি), মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

ফোন : ০১৯১৪৭৫৩৮৬৮

E-mail: [email protected]