বুধবার ৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিপর্যয় বাড়তে পারে

এএইচএম মাহবুবুল হাসান ভুইয়া পিংকু   |   বৃহস্পতিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২ | প্রিন্ট

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিপর্যয় বাড়তে পারে

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে অনুভূত হচ্ছে। মানুষ এবং প্রকৃতিকে ২০ বছর আগের তুলনায় আরও চরম আবহাওয়া মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তাপমাত্রার পরিবর্তন বা ভারি বৃষ্টিপাতের মতো ঘটনাগুলো প্রায়ই ঘটছে। পশুপাখি, কৃষি ও মানুষের মধ্যে ক্রমেই প্রাণঘাতী রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের কার্যকলাপের ফল, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটাতে পারে। করোনা মহামারি ও ইউক্রেন সংকটের মধ্যে আরও একটি দুঃসংবাদ পেল বিশ্ব। জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত জাতিসংঘের আন্তঃসরকার প্যানেল (আইপিসিসি) তাদের সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এখনই কমানো না গেলে খুব শিগগির বিশ্ববাসীকে গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হবে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অবিলম্বে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে বিশ্বে খরা, বন্যা ও তাপপ্রবাহের মতো বিপর্যয় বাড়তেই থাকবে। জাতিসংঘ বলছে, এ ধরনের প্রবণতা রোধ করতে একটি সুস্থ বাস্তুতন্ত্র এবং সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে হবে। এটি সম্ভব হলে জনগণের কল্যাণ ও জীবনযাত্রার পথ টেকসই হবে।

জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয়ের কারণে গত চার দশকে বাংলাদেশের ক্ষতির আর্থিক মূল্য ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি। দেশের অর্থনীতি ও বিভিন্ন খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের কী কী প্রভাব আছে, তা নিরূপণের জন্যে গবেষণা করেছে সেন্টর ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিস (সিইজিআইএস)। এর ভিত্তিতে সংস্থাটি একটি জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি) প্রকাশ করেছে।

এতে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতিবছর কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতির পরিমাণ মোট জিডিপির দশমিক ৫ থেকে ১ শতাংশ। ২০৫০ সালে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে জিডিপির প্রায় ২ শতাংশে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ বছরে দেশে সুপার সাইক্লোন বেড়েছে ৬ শতাংশেরও বেশি। প্রতিবছর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে দশমিক শূন্য ১৫ সেন্টিগ্রেড হারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতও বেড়েছে। দেশের বার্ষিক বৃষ্টিপাত বৃদ্ধির গড় হার ৮ দশমিক ৪ মিলিমিটার। গত কয়েক দশকে ভয়াবহ ও মারাত্মক বন্যা হয়েছে পাঁচটি। দেশের পাহাড়ি এলাকা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে ঢল ও বজ্রপাতের প্রকোপ বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতিবছর ৩০৬ মিলিমিটার করে বাড়ছে। সিইজিআইএস প্রণীত জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগামী ২৭ বছরে কমপক্ষে ৮ হাজার ৪০০ কোটি ডলার প্রয়োজন হবে বলে অনুমান করা হয়।

গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে সামনের দিনগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির পরিমাণ বিগত দিনের তুলনায় অনেক বেশি হবে। সমুদ্রের পানির উচ্চতা ৫০ সেন্টিমিটার বাড়লেই সমুদ্র উপকূলের ১০ শতাংশ এলাকা তলিয়ে যাবে। লবণাক্ততা ছড়াতে পারে ৭ হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত। আর যদি সমুদ্রের পানি ৯৫ সেন্টিমিটার বেড়ে যায়, তাহলে তলিয়ে যাবে উপকূলের ১৭ শতাংশ এলাকা। সেক্ষেত্রে লবণাক্ততা ছড়াতে পারে ১৬ হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উষ্ণায়ন ২ ডিগ্রির মধ্যে রাখার কথা বলা হলেও ইন্টার-গভর্নমেন্টাল প্যানেল ফর ক্লাইমেট চেইঞ্জ (আইপিসিসি) মনে করে, উষ্ণায়ন ৩ থেকে সাড়ে ৩ ডিগ্রিতে চলে যাবে। এর ফলে বাংলাদেশে খাদ্য সংকট দেখা দেবে। আবহাওয়া ও জলবায়ুর যে পরিবর্তন হচ্ছে, তাতে উপকূলের প্রায় ৩ কোটি মানুষ বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টির কারণে দেশের কৃষিকাজও নানাভাবে ব্যাহত হবে।

আইপিসিসি বলছে, বিশ্বের সরকারগুলো জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তিতে প্রতিশ্রুত বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ করবে না। বিপরীতে বায়ুম-লে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ বাড়ছে। এমনকি কয়েক দশকের গড় নির্গমন সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এ বছরটিই সম্ভবত এ শতাব্দীর সবচেয়ে শীতলতম একটি বছর হবে। কারণ, আমাদের গ্রহ ক্রমাগত উত্তপ্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় আগামী কয়েক দশকে বিশ্বে তাপমাত্রা তিন ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বৃদ্ধির দিকে যাচ্ছে। এ হারে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা বিশ্বকে এতটাই উত্তপ্ত করবে, এতে স্বাভাবিক কাজকর্ম করা যাবে না। ফসলের চাষাবাদ ও জীবনযাপন অসহনীয় হয়ে ওঠবে। বরফের পাহাড়গুলো গলতে গলতে অদৃশ্য হয়ে যাবে এবং বড় শহরগুলো ডুবে যাবে। কিন্তু সরকারগুলো এখনো তাদের স্বার্থ ত্যাগ করতে দ্বিধাগ্রস্ত। তারা জীবাশ্ম জ্বালানিতে তাদের করা বিনিয়োগ রক্ষার দিকে বেশি মনোনিবেশ করে আসছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উল্লেখ করেছেন, এ ব্যবস্থা চলতে পারে না। পৃথিবী দ্রুত জলবায়ু বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের দেশ এবং করপোরেশনগুলো শুধু একটি গ্রহগত বিপর্যয় দেখার ভান করছে না, আগুনের লেলিহান শিখায় ইন্ধনও দিচ্ছে।

বাংলাদেশ ১৭ কোটি জনসংখ্যার দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যেমন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো, ভূমিকম্প, নদীভাঙন এবং জলাবদ্ধতা, মাটির লবণাক্ততা প্রভৃতির কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অন্যতম। এ জলবায়ু পরিবর্তন দেশের কৃষি, অবকাঠামো ও জীবনযাত্রার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। ইতোমধ্যেই সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলে অকাল বন্যা হয়েছে।  অস্বাভাবিক তাপমাত্রার কারণে এ বছর কলেরার প্রার্দুভাব দেখা দিয়েছে। ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ বেড়েছে।

জলবায়ু গবেষক ড. মতিউর রহমান বলেন,  ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেও বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশ সমতল ও নিচু ভূমি এলাকা নিয়ে গঠিত। জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের নাগরিক এবং সরকারের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে। দেশের ৮০ শতাংশেরও বেশি জমি বন্যাপ্রবণ। বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কৃষিকাজে নিয়োজিত, তাই জলবায়ু পরিবর্তন কৃষকদের খারাপভাবে প্রভাবিত করবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ২১০০ সালের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হবে। যা বিশ্ব ব্যাংকও বলেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা তিন ফুট বাড়বে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এতে দেশে ব্যাপক বন্যা হবে এবং ফসলহানি ঘটবে। এ কারণে দারিদ্র্য ও মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

সূত্র মতে, ২৭তম জলবায়ু সম্মেলন সামনে। পরিবেশ রক্ষায় সেখানে নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে। কিন্তু প্যারিস জলবায়ু বৈঠকে ১২০টি দেশ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা পূরণ হয়নি। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে এটি স্পষ্ট। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি শতাব্দীতে বিশ্বের তাপমাত্রায় দূষণের মাত্রা ২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে। যদিও প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে সব পক্ষ একমত হয়েছিল, তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির সীমার মধ্যে রাখতে হবে। তবে তার আগে আগামীকাল থেকে জার্মানীতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১০দিন ব্যাপী জলবায়ু সম্মেলন নিয়ে প্রাক আলোচনা। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করবেন। জার্মানীর এই সম্মেলনে নেয়া প্রদক্ষেপগুলো মিসরে অনুষ্ঠিতব্য জলবায়ু সম্মেলনে তুলে ধরা হবে। বলা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি রোধ করতে হলে প্রতিবছর বিশ্বের কার্বন নিঃসরণ ২৬ গিগাটন কমাতে হবে অর্থাৎ, প্রতিটি দেশকে তাদের বার্ষিক কার্বন নিঃসরণ ৩০ শতাংশ কমাতে হবে। এটি ২০২২ সাল। আর মাত্র আট বছর বাকি। সুতরাং, এখনই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করলে বিশ্বকে আরও ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্যারিস জলবায়ু সম্মেলন প্রতিটি দেশকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করার অনুমতি দিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এখন এটা স্পষ্ট, কোনো উল্লেখযোগ্য লাভ হয়নি। এ কারণে তাপমাত্রা বেড়েছে ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সম্মেলনে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে আগামী দিনে ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ বছর বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। দাবানল, তাপপ্রবাহ ও বন্যায় প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আবহাওয়ার বিচিত্র রূপ দেখা যাচ্ছে সর্বত্র।

সূত্র মতে, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশের এই বিপর্যয়কে বাংলাদেশ বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান-এ দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোনো দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সত্যিই পড়ছে কিনা, তা চারটি মানদন্ডে বিবেচনা করা হয় ১. জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ২. কোথায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেশি হচ্ছে ৩. সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা কোথায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ৪. ক্ষতিগ্রস্ত দেশটি ক্ষতি মোকাবিলায় বা অভিযোজনের জন্য এরই মধ্যে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ একাধারে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার এবং হিমালয়ের বরফ গলার কারণে নদীর দিক পরিবর্তন, বন্যা ইত্যাদি সবগুলো দিক দিয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রাও অনেক বেশি। তাই উল্লেখিত চারটি মানদন্ডেই বাংলাদেশ রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় শীর্ষে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ-এর এ প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতির বিচারে শীর্ষ ১০টি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে প্রথমেই অবস্থান করছে বাংলাদেশ। এই সমীক্ষা চালানো হয় ১৯৯০ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত ১৯৩টি দেশের উপর। পরবর্তীতেও অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

আবহমান কাল থেকে এদেশে ঋতুবৈচিত্র্য বর্তমান। ছয় ঋতুর কারণে দেশটিকে ষড়ঋতুর দেশও বলা হয়ে থাকে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে বাংলাদেশের এই স্বাভাবিক চিত্রটি এখন অনেকখানি বদলে গেছে। তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রস্তর সর্বদিক দিয়ে সংঘটিত এসকল পরিবর্তন বাংলাদেশে জলবায়ুগত স্থূল পরিবর্তন সৃষ্টি করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নদ-নদীর পানিপ্রবাহ শুকনো মওসুমে স্বাভাবিক মাত্রায় থাকে না। ফলে নদীর পানির বিপুল চাপের কারণে সমুদ্রের লোনাপানি যতটুকু এলাকাজুড়ে আটকে থাকার কথা ততটুকু থাকে না। কম বৃষ্টিপাতের কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার সমস্যা দিনে দিনে আরো প্রকট হয়ে উঠবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যেই সুন্দরবনের সুন্দরী গাছে ব্যাপক মাত্রায় আগামরা রোগ দেখা দিয়েছে। গবেষকরা একে প্রাকৃতিক কারণ হিসেবেই শনাক্ত করেছেন। বাংলাদেশ নাতিশীতোষ্ণ তাপমাত্রার দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও বিগত কয়েক বছরে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক আচরণে সেই পরিচিতি ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ১৯৬০ সালে এই এলাকায় সর্বোচ্চ ৪২.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নথিভুক্ত করা হয়। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ৩০ মে তাপমাত্রা নথিভুক্ত করা হয় ৪৫.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, রাজশাহীতে। ১৯৯৫ সালে এসে নথিভুক্ত করা হয় ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০০৯ সালের ২৬ এপ্রিল নথিভুক্ত করা হয় বিগত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যশোরে। তাপমাত্রার এই পরিসংখ্যানে আপাতদৃষ্টিতে যদিও মনে হচ্ছে তাপমাত্রা কমছে, কিন্তু বস্তুুত, অতীতের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা ছিলো কম, অথচ বর্তমানে সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা অত্যধিক বেশি। আবহাওয়া অধিদপ্তরসূত্রে জানা যায়, গত ৫০ বছরে দেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ০.৫%। এমনকি ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের তাপমাত্রা গড়ে ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিনে দিনে বৃষ্টিপাত কমে যাচ্ছে, সময়মত হচ্ছে না বন্যা। ২০০৮ সালে বাংলাদেশের গড় বৃষ্টিপাত ছিল ২৩০০ মিলিমিটার। বরেন্দ্র এলাকায় গড় বৃষ্টিপাত হয়েছিল ১১৫০ মিলিমিটার। এরকম স্বল্প বৃষ্টিপাত দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গিয়ে খরায় আক্রান্ত হবে বিপুল সংখ্যক মানুষ, যার মধ্যে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের লোকই বেশি। এরকম খরায় কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার ব্যাপারে বিভিন্ন উৎস থেকে আলাদা আলাদা উপাত্ত পাওয়া যায়। কারো মতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ খরায় উদ্বাস্তু হবে প্রায় ৮০ লক্ষ মানুষ। বিভিন্ন স্থানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস পেয়ে দেখা দিচ্ছে স্থায়ী মরুকরণ। রাজশাহীর বরেন্দ্র এলাকায় বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নেমে যাচ্ছে পানির স্তর। এছাড়া সুপেয় পানির অভাবে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যাপক ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায়ও ভূগর্ভস্থ পানি কমে যাচ্ছে। জাতিসংঘের আন্তঃসরকার জলবায়ু পরির্বতন-সংক্রান্ত প্যানেলের পানিসম্পদের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে তৈরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ সমুদ্রতীরের বেশ কটি দেশে সামনের দিনে মিঠা পানির তীব্র সংকট দেখা দেবে।

সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয় ক্যারিয়ার এন্ড প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস বিভাগের কর্মকর্তা মো: আরাফাত রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে নানারকম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। শ্বাসকষ্ট, হিটস্ট্রোক বা গরমজনিত মৃত্যু কিংবা তীব্র ঠান্ডাজনিত মৃত্যু ইত্যাদি এখন খুব সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভূমন্ডলীয় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রভাবিত হবে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা। উপকূলীয় এলাকায় বর্ধিত হারে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিপুল সংখ্যক মানুষ। এসকল আশ্রয়হীন উদ্বাস্তুরা আশ্রয় নিচ্ছে নিকটবর্তী বড় শহরগুলোতে কিংবা রাজধানী শহরে। ফলে বাড়ছে সেসব শহরের জনসংখ্যা। বাড়তি জনসংখ্যার চাপ সামলাতে সেসব শহরগুলো হিমশিম খাচ্ছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার জন্য আয়ের অতিরিক্ত উৎস তৈরি না হওয়াতে উদ্বাস্তু মানুষেরা বেছে নেয় নানা অপকর্মের পথ। সমাজে দেখা দিতে শুরু কেের বিশৃঙ্খলা, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটতে থাকে দিনের পর দিন।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মুঈদ রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বা পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার বিভিন্ন কারণের মধ্যে রয়েছে-প্রকৃতির প্রতি অবিচার, বন উজাড়, শিল্প-কারখানা থেকে নির্গত বর্জ্য, কালো ধোঁয়া, যানবাহনের কারণে পরিবেশ দূষণ। কিন্তু এর সমন্বিত কারণ হলো কার্বন নিঃসরণ। এই কার্বন নিঃসরণের অন্যতম কারণ হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার। আয়োজকরা ২০৫০ সাল নাগাদ কার্বন নিঃসরণের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধে কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি, কয়লার ব্যবহার নিষিদ্ধও করতে পারেননি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সম্প্রতি এক ভার্চুয়াল সেমিনারে বলেছেন, বাংলাদেশের এক কোটি মানুষ এরইমধ্যে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছেন। সমূদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীর পানির লবণাক্ততা বাড়া, নদী ভাঙন এবং ঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে যাওয়ার অভিঘাতে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৭:৩৮ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০  
সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া
সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭। সম্পাদক কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি), মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

ফোন : ০১৯১৪৭৫৩৮৬৮

E-mail: [email protected]