বুধবার ৭ই ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী হলুদ জার্সি বর্জনের হিড়িক, কিন্তু কেন?

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০২২ | প্রিন্ট

ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী হলুদ জার্সি বর্জনের হিড়িক, কিন্তু কেন?

দরজায় কড়া নাড়ছে ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২২। শুরু হয়েছে বিশ্ব ফুটবলের মহাযজ্ঞের ক্ষণগণনাও। কাতারে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। বিশ্বকাপ উন্মাদনায় গা ভাসাতে প্রস্তুত ভক্তরাও। তেমনই একজন ফুটবল অনুরাগী ব্রাজিলের হিগর রামালহো। করোনা সংক্রমণ কমে আসায় বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার পর আবারও আগের মতোই ফুটবল স্টেডিয়ামের উৎসাহ-উদ্দীপনায় মেতে উঠতে প্রস্তুত তিনি। যদিও ২০১৮ সাল থেকে ব্রাজিল জাতীয় দলের বিখ্যাত হলুদ জার্সিটি পড়ে আছে রামালহোর আলমারিতেই, যার পেছনে রয়েছে ভিন্ন এক গল্প।

শেষবার নিজের জন্মদিনে আবেগমাখা জার্সিটি গায়ে জড়িয়েছিলেন হিগর রামালহো। এমনকি আবারও সেটি পরবেন কিনা, তা নিশ্চিত নন তিনি। কিন্তু কেন নিজের পছন্দের পোশাকটি গায়ে জড়াতে এত অনীহা?

উত্তরে ৩৩ বছর বয়সী রামালমো বলেন, ‘হলুদ জার্সি পরা ছিল আমার জন্য গর্বের। এটা ছিল বিজয়ের প্রতীক। আমি এটা শুধু ম্যাচ দেখার সময়ই নয়, নিয়মিতই পরতাম। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে এখন জার্সিটি পরা বন্ধ করে দিয়েছি। কারণ আমাদের বর্তমান প্রেসিডেন্ট (জইর বলসোনারো) তার সমর্থকদের নিয়ে হলুদ জার্সিকে রাজনৈতিক প্রচারণা এবং তাদের রাজনৈতিক দলের প্রতীকে পরিণত করেছেন। আমি তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ সমর্থন করি না, আমি তাদের একজন হতে রাজি নই।’

সবসময় ব্রাজিল জাতীয় দলের জার্সি ছিল না ‘ক্যানারিনহো জার্সি’ নামে পরিচিত এ হলুদ জার্সি। মারাকানায় ১৯৫০ সালে উরুগুয়ের কাছে বিশ্বকাপের স্বপ্নভঙ্গের তিন বছর পর ১৯৫৩ সালে এটি ডিজাইন করা হয়েছিল। এর আগে পর্যন্ত ব্রাজিলের জাতীয় দলের জার্সির রঙ ছিল সাদা।

স্থানীয় একটি সংবাদপত্রের সঙ্গে মিলে জাতীয় দলের জন্য নতুন জার্সি ডিজাইন করতে এক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল জাতীয় ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা। শর্ত দেয়া হয়, নতুন জার্সিতে জাতীয় পতাকার রঙ থাকতে হবে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, আগের জার্সিটি ব্রাজিলের ‘জাতীয়তার ধারণা বহন করে না’।

এরপর কেটে গেছে অনেক বছর। হলুদ জার্সিতে রেকর্ড পাঁচটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি কোপা আমেরিকা জয়সহ অসংখ্য অর্জন ব্রাজিলের। ফলে এই হলুদ জার্সিই আশাবাদ, ভাগ্য এবং ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে ফুটবল ভক্তদের মধ্যে।

ব্রাজিলের জাতীয় দলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও তিনবার বিশ্বকাপজয়ী একমাত্র ফুটবলার পেলের ১০ নম্বর জার্সি, রোনালদোর ৯ নম্বর কিংবা ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে রোমারিওর ১১ নম্বর জার্সি, এসবই মাঠে ব্রাজিলের সমৃদ্ধ এবং সফল ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে।

কিন্তু অতি সম্প্রতি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো এবং তার ডানপন্থি সমর্থকদের রাজনৈতিক প্রচারণায় এই জার্সির ব্যবহার শুরু হয়েছে। ফলে নানা ইস্যুতে আলোচিত-সমালোচিত বলসোনারোর এমন কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ ফুটবল সমর্থকরা একরকম বাধ্য হয়েই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বিখ্যাত হলুদ জার্সি থেকে।

ইসাবেলা গুয়েদেস নামের একজন ব্রাজিলিয়ান সমর্থক বলেন, ‘ফুটবল ব্রাজিলের জন্য আইকনিক একটি বিষয়, যা বেশিরভাগ সময় সবাইকে একত্রিত করে। যখন তারা (বলসোনারোর ডানপন্থি সমর্থকরা) দেশের জন্য অর্থপূর্ণ কিছু কেড়ে নিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশে তা ব্যবহার করে, তখন মনে হয় তারা আমাদের কাছ থেকে এটি চুরি করছে। তারা জাতীয় পতাকা ও হলুদ জার্সিকে রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করেছে।’

রিও ডি জেনেরিও স্টেট ইউনিভার্সিটির ল্যাবরেটরি অব মিডিয়া অ্যান্ড স্পোর্টস স্টাডিজের গবেষক ক্যারোলিনা ফন্টেনেলের মতে, জার্সির এই ‘অপব্যবহার’ বলসোনারো সমর্থকরা শুরু করেননি। ১৯৭০ সালে সেনা শাসনের সময়ও জাতীয় পতাকা এবং ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দলের ইমেজ ব্যবহার করা হয়েছে।

ব্রাজিলের তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল মেডিসিও ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের আগে জাতীয় দলের কোচকে অপসারণে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্রাজিলিয়ান এবং তাদের দলের জার্সির মধ্যে একটি শক্তিশালী সংযোগ তৈরি হয়েছিল।

গবেষক ফন্টেনেলের মতে, এরপর থেকে ধীরে ধীরে হলুদ জার্সি ব্রাজিলের মানুষের অনুভূতির একটি অংশ হয়ে ওঠে। তারা জার্সিটি গর্বের সঙ্গে গায়ে জড়ান। কারণ এর মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের একটি গোষ্ঠীর অংশ বলে মনে করে।

এর আগে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্নীতি এবং পুলিশি বর্বরতার প্রতিবাদে ২০১৩ সালে ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গার সময়ও এই হলুদ জার্সির অন্য একদিক নজরে পড়ে। এ জার্সি পরে অসংখ্য লোকজন দাঙ্গায় অংশ নিয়েছিল। আর ২০১৮ সালে এসে সেটি পরা শুরু করেন ডানপন্থিরা।

ক্যারোলিনা ফন্টেনেল বলেন, ‘জার্সি একটি অনুভূতি দেয় যে আপনি একটি গোষ্ঠীর অন্তর্গত এবং এই অনুভূতিটি হারিয়ে যায় যখন কোনো রাজনৈতিক দল এটি ব্যবহার করা শুরু করে।’

বছর দুয়েক আগে লেখক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা জোয়াও কার্লোস অ্যাসুম্পকাওর নেতৃত্বে একটি প্রচারণা শুরু হয়। দাবি ওঠে, বিখ্যাত হলুদ জার্সি বাতিল করে সাদা জার্সি ফিরিয়ে আনার। প্রচারণাকারীরা বলেন, ‘পতাকা চুরি করা একটি ভয়ংকর সরকারের সঙ্গে আমরা একটি ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আছি।’

সাও পাওলোর ফুটবল জাদুঘরের গ্রন্থাগারিক এবং ইতিহাসবিদ আদেমির তাকারার মতে, ফুটবল সবার জন্য। বর্ণবাদ, লিঙ্গবাদ এবং বৈষম্যকে প্রচার করে এমন লোকেরা এ জার্সি ব্যবহার করছে, যা আমার পছন্দ নয়। ২০১৩ সাল থেকে এটি (ব্রাজিলের জার্সি) আগের চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক বিষয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন মতাদর্শের লোকরা এটি ব্যবহার করছেন। নিজ নিজ এজেন্ডা বাস্তবায়নে এ জার্সিকেই তারা বেছে নিয়েছে হাতিয়ার হিসেবে।

জার্সির প্রতি ভালোবাসার কথা উল্লেখ করে মেরিনা মোরেনো নামে এক ফুটবল ভক্ত জানান, তিনি হলুদ জার্সিটিকে বর্তমান সরকারের ‘প্রতীক’ হয়ে উঠতে দেখে হতাশ হয়েছেন। মেরিনা বলেন, ‘বর্তমান প্রেসিডেন্ট এবং তার সমর্থকদের এমন কর্মকাণ্ড হতাশাজনক। আমি বর্তমান সরকারকে সমর্থন করি না এবং আমি তাদের সমর্থক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপনও করতে চাই না। তাই আমি ব্রাজিলের হলুদ জার্সি আর না পরার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

এদিকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জইর বলসোনারোর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী মধ্যবামপন্থি লুলা ডি সিলভা সম্প্রতি এক টুইট বার্তায় লিখেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি ব্রাজিল তার পতাকা, তার সার্বভৌমত্ব এবং তার গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করবে।’

সূত্র: আল জাজিরা

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৩:২২ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০২২

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া
সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭। সম্পাদক কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি), মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

ফোন : ০১৯১৪৭৫৩৮৬৮

E-mail: [email protected]