বুধবার ৩০শে নভেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

হারিয়ে গেছে যে সাগর

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বুধবার, ২৩ নভেম্বর ২০২২ | প্রিন্ট

হারিয়ে গেছে যে সাগর

আরাল সাগর। নামের সঙ্গে সাগর শব্দটি যুক্ত থাকলেও এটি মূলত হ্রদ ছিল। তবে বিশালতার কারণে আরবদের কাছে এই হ্রদটি পরিচিত ছিল সাগর হিসেবে। ভূগোলের পরিভাষায় আরাল এখনও সাগর। তবে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সাগর। এখন আরাল সাগর ছোট জলাশয়ে রূপ নিয়েছে।

১৯৬০ সালের দিকে আরাল সাগর পৃথিবীর বুকে চতুর্থ বৃহত্তম হ্রদ ছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে আরাল সাগরের বয়স প্রায় ৫.৫ মিলিয়ন বছর। এই সাগরের জলরাশি কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান এবং মধ্য এশিয়ায় বিস্তৃত ছিল। উত্তর থেকে সির দরিয়া ও দক্ষিণ থেকে আমু দরিয়া নদী থেকে পানি এসে মিশত আরালের বুকে। ১৯৯৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, ৬৭ হাজার বর্গ কিমি আয়তনের হ্রদটির প্রায় ৭০ শতাংশ শুকিয়ে গেছে। আর এই হ্রদের পানি শুকিয়ে যাওয়ার পেছনে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আরাল সাগরের শুকিয়ে যাওয়ার ঘটনা বর্তমান পৃথিবীর জন্য এক অশনিবার্তা।

এই সাগর শুকিয়ে যাওয়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের তুলা চাষকে। সোভিয়েত তখন আমেরিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। ক্রেমলিন বনাম হোয়াইট হাউসের হিমশীতল লড়াই চলছে। বিশ্ববাজারে তুলা উৎপাদনের শিরোপা ধরে রাখতে মরিয়া সোভিয়েত। এ কারণে তুলা চাষের ওপর বড়সড়ো নজর দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। বর্তমান কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তান সে সময়ে সোভিয়েতের অধীন ছিল। সোভিয়েত সরকারের আদেশেই শুরু হয় তুলার চাষ। সোভিয়েত সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, আমু এবং সির দরিয়ার পানি তুলাক্ষেতে সেচের জন্য ব্যবহার করা হবে।

১৯৫৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন কারাকুম খাল খনন করে। যার দৈর্ঘ ছিল ১৩৭৫ কিলোমিটার। এখন পর্যন্ত এটিই পৃথিবীর দীর্ঘতম সেচ খাল। এ খাল দিয়েই আমু ও সির দরিয়ার পানি কারাকুম মরুভূমির ভেতর দিয়ে তুলাক্ষেতে প্রবাহিত করা হতো। এই দীর্ঘ পথে ৩০ শতাংশ পানি অপচয় হতো। এ ছাড়াও আরও বিভিন্ন বাঁধ ও খাল খনন করা হয় সে সময়। যার মাধ্যমে নদির গতপথ পরিবর্তন হয়ে যায়। পানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় হ্রদের পানিতে লবণের পরিমাণ বাড়তে থাকে, যার ফলে হ্রদের মাছ সব মরে যায়। সেই সঙ্গে কৃষি কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়। আরাল সাগরের ধ্বংসের শুরুটা এখানেই।

আরালের মাছ ধরে অনেক অধিবাসী জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু, ১৯৬০-৭০-এর দিকে বিশাল হ্রদের পানি দ্রুত শুকিয়ে যেতে থাকে। এরপর ১৯৮০ সালে আমু দরিয়া নদীতে বাঁধ দেয়া হয়। ১৯৮৭ সালে হ্রদের পানি শুকিয়ে দুই ভাগ হয়ে যায়। ১৯৯৮ সালে ৯০ শতাংশ পানি শুকিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে হ্রদের পানিতে লবণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার ফলে আবহাওয়ায় বড় রকমের পরিবর্তন ঘটে। ঝড়-তুফানের পরিমাণ বেড়ে যায় বহুগুণে। এ ছাড়াও বিভিন্ন গবেষণাগারের রাসায়নিক বর্জ্য, বিষাক্ত কীটনাশক, শিল্পকারখানার বর্জ্য আরাল সাগরের পানিতে নিষ্কাশন করা হতো। পরবর্তী সময়ে আরালের অধিবাসীরা উপায় না দেখে অন্য প্রদেশে চলে যেতে থাকেন।

সোভিয়েত লুপ্ত হয় নব্বই দশকে। আরল সাগর তীরের কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তান দুটি স্বাধীন দেশ তৈরি হয়। ১৯৯৭ সালের শুরুর দিকে করা জরিপ অনুযায়ী, আরাল সাগরের প্রায় ৯০ শতাংশ পানি শুকিয়ে গেছে। অর্থাৎ, এক সময়ের বিশাল আরাল সাগর সামান্য জলাশয়ে পরিণত হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে আরল সাগর বাঁচাতে একজোট হয় কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তান। ২০০৩ সালে কাজাখস্তান সরকার বাঁধ নির্মাণ করে নদীর পানি আরাল সাগরের দিকে প্রবাহিত করার উদ্যোগ নেয়। ২০০৫ সালে বাঁধ নির্মাণের পর কাজাখ অঞ্চলের দিকে পড়া আরল সাগরের অংশে পানির স্তর বাড়ে। এরপর উজবেকিস্তানের অংশে বাঁধ দিয়ে আরল সাগরের পানির স্তর বাড়িয়ে দিতে উদ্যোগী হয়। উজবেকিস্তানের দিকে এই প্রকল্প তেমন সফল হয়নি। পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাংক এ কাজে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়। কাজাখ সরকারকে ৬৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ প্রদান করা ছাড়াও প্রায় ৮৬ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প হাতে নেয় বিশ্বব্যাংক। ২০০৮ সালে দ্বিতীয় বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে পুনরায় উত্তর আরাল সাগরে পানিপ্রবাহ শুরু হয়। এ ছাড়াও এগিয়ে এসেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, নরওয়ে, ইউনাইটেড আরাব আমিরাত। পুনরায় আরাল সাগরে মৎস্যশিল্প গড়ে উঠেছে।

২০১৪ সালে নাসা প্রকাশিত উপগ্রহ চিত্রে দেখা যায়, এর পূর্বাঞ্চলীয় দিকটি পুরোটা শুকিয়ে গেছে। এই অঞ্চলটি এখন কারাকুম মরুভূমি নামে পরিচিত। আরল সাগর বিপর্যয়কে গত শতাব্দীর মানুষ সৃষ্ট সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়। একসময় খুব সহজেই এ সাগর থেকে একশ কেজি মাছ ধরে ফেলা যেতো। লেকের তীরে তরমুজ, গমের চাষও হতো আগে। তবে এখন তা মরুভূমি। অদূর ভবিষ্যতে আরাল সাগর আবার তার হারানো জীবন-যৌবন ফিরে পাবে, স্থানীয় জেলেরা এখন এই আশাতেই বিভোর হয়ে আছেন।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৩:০২ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ২৩ নভেম্বর ২০২২

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া
সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭। সম্পাদক কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি), মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

ফোন : ০১৯১৪৭৫৩৮৬৮

E-mail: [email protected]