মঙ্গলবার ৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ | ২৪শে মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

যেভাবে শত্রু মুক্ত হয় যশোর 

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২ | প্রিন্ট

যেভাবে শত্রু মুক্ত হয় যশোর 

যশোর মুক্ত দিবস আজ ৬ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এ দিনে পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত হয়েছিল যশোর জেলা। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর তীব্র প্রতিরোধে এদিন যশোর সেনানিবাস ছেড়ে পালিয়ে যায় পাক হানাদার বাহিনী। শত্রুমুক্ত হয় যশোর জেলা। আকাশে ওড়ে বিজয়ী বাংলাদেশের রক্ত সূর্যখচিত গাঢ় সবুজ পতাকা।

দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের লক্ষ্যে মঙ্গলবার জেলা প্রশাসন নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। যশোরের জেলা প্রশাসক মো. তমিজুল ইসলাম খান বলেন, ৬ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত দিবস। ১১ ডিসেম্বর যশোরের ঐতিহাসিক টাউন হল মাঠে স্বাধীন বাংলায় প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। মহান বিজয়ের মাস উপলক্ষে যশোরে জেলা প্রশাসন স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ বিভিন্ন সংগঠন মাসব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ৬ ডিসেম্বর উপলক্ষে সকালে টাউন হলমাঠ থেকে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বেরিয়ে শহরের বকুলতলায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরালে গিয়ে শেষ হবে। এ ছাড়া আলোচনাসভাসহ নানা কর্মসূচি রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিব বাহিনীর (বিএলএফ) বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের উপ-প্রধান এবং বৃহত্তর যশোর জেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক রবিউল আলম বলেন, ২ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনী যশোরের সীমান্ত চৌগাছা ও শার্শায় অবস্থান নেয়। ৩-৪ ও ৫ ডিসেম্বর সীমান্ত এলাকায় পাক বাহিনীর সঙ্গে মিত্রবাহিনীর ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। মিত্র বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধারাও অংশ নেন। ৫ ডিসেম্বর লড়াই প্রচণ্ড আকার ধারণ করে। মুহুর্মুহু বোমা ও বিমান হামলা হয়। রাতে বহুদূর থেকে চৌগাছা সীমান্ত এলাকায় আগুনের গোলা দেখা যায়। ৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় পাকবাহিনী পিছু হটে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য খুলনার দিকে রওনা হয়। ওই দিনই যশোর মুক্ত হয়।

এর আগে ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ যশোর শহরে মুক্তিকামী জনতার জঙ্গি মিছিলে পাক বাহিনী গুলি চালালে শহীদ হন চারুবালা কর। স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনিই প্রথম শহীদ। এরপর যশোরে সংগঠিত হতে থাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী প্রতিরোধের আন্দোলনকারীরা। এর নেতৃত্ব দেয় সংগ্রাম পরিষদ। সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হতে থাকে ছাত্র, যুবক ও নারীদের।

২৬ মার্চ পাকিস্তানি জল্লাদ বাহিনী তদানীন্তন জাতীয় সংসদ সদস্য মশিয়ুর রহমানকে তার বাসভবন থেকে ধরে যশোর সেনানিবাসে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। ২৯ মার্চ পাকবাহিনী যশোর শহর ছেড়ে সেনানিবাসে চলে যায়। ৩০ মার্চ যশোর সেনানিবাসে বাঙালি সৈনিকেরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লেফটেন্যান্ট আনোয়ারসহ অনেকেই এখানে শহীদ হন। ৩০ ও ৩১ মার্চ মুক্তিকামী জনতা মিছিল সহকারে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে হামলা চালায়। মুক্তি পায় সব রাজবন্দি। জুলাই মাস থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধের গতিধারা পাল্টে যায়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা যশোর শহর ও অন্যান্য এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানগুলোতে প্রচণ্ড আক্রমণ চালাতে থাকে।

যশোর ৮ নম্বর সেক্টরের প্রথম দিকের কমান্ডার ছিলেন কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরী। পরবর্তীতে কমান্ডার নিযুক্ত হন মেজর মঞ্জুর। যশোরের শার্শা উপজেলার কাশিপুর সীমান্তের বয়রা অঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ৫ সেপ্টেম্বর শহীদ হন বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ। যশোর সেনানিবাস থেকে শত্রুবাহিনী বিভিন্ন জেলা নিয়ন্ত্রণ করতো।

২০ নভেম্বর মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী যশোর সেনানিবাস দখলে অভিযান শুরু করে। পাকিস্তানি বাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি চৌগাছা ঘিরে ফেলে সম্মিলিত বাহিনী। জগন্নাথপুর ও সিংহঝুলির যুদ্ধের পর ২২ নভেম্বর রাতে চৌগাছা শত্রুমুক্ত হয়। এ দুটি যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী হেরে গেলে তাদের মনোবল ভেঙে পড়ে। এ সময় যশোর সেনানিবাসের তিনদিকেই মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসে।

৫ ডিসেম্বর যশোর ক্যান্টনমেন্টের অদূরে মনোহরপুর গ্রামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল লড়াইয়ের পর একপর্যায়ে পাক বাহিনী অস্ত্রশস্ত্র ফেলে পিছু হটে যশোর ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নেয়। যশোরে প্রতিরোধ যুদ্ধের শেষ অভিযান চলে ৫ ও ৬ ডিসেম্বর। যুদ্ধে টিকতে না পেরে ৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী যশোর ছেড়ে পালিয়ে যায় খুলনার দিকে। শত্রুমুক্ত হয় যশোর জেলা। মুক্তিযোদ্ধারা ও মিত্রবাহিনীর সদস্যরা বয়ে আনেন যশোরবাসীর জন্য এক বিরল সন্মান। যুদ্ধবিধ্বস্ত মুক্ত যশোর কালেক্টরেটসহ শহরে ওড়ে স্বাধীন দেশের গৌরবময় পতাকা।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৪:৫১ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া
সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭। সম্পাদক কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি), মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

ফোন : ০১৯১৪৭৫৩৮৬৮

E-mail: [email protected]