বুধবার ৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

গ্রাহক নয়, কর্মীদের নিয়ে ভাবে যে কোম্পানিগুলো

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   রবিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২২ | প্রিন্ট

গ্রাহক নয়, কর্মীদের নিয়ে ভাবে যে কোম্পানিগুলো

ব্যবসায় খাতে একটি প্রাচীন নীতি হচ্ছে: ‘কাস্টমার ফার্স্ট’। অর্থাৎ গ্রাহককে সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে। তবে করোনা-পরবর্তী সময়ে এসে নানা গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রাহক নয়, গুরুত্বের সারিতে প্রথমে রাখা উচিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের।

একটি প্রতিষ্ঠানের প্রাণ হচ্ছে সেটির কর্মী। কিন্তু বহুকাল ধরে প্রতিষ্ঠানগুলোতে গ্রাহককে সেবা দিতে গিয়ে নিগৃহীত হয়ে আসছিল কর্মীদের অধিকার। অনেকেই এমন সব চাকরি করছিলেন, যা তাদের পছন্দসই না। শুধু টাকার জন্য ইচ্ছার বিরুদ্ধে বন্ধুসুলভ নয় এমন সব জায়গায় কাজ করে হাঁপিয়ে উঠছিলেন সাধারণ চাকরিজীবীরা।

করোনার সময় দীর্ঘ লকডাউনে বদলে গেছে অনেক কিছু। সবচেয়ে বেশি বদলেছে মানুষের জীবনবোধ। চোখের সামনে মৃত্যু দেখে মানুষ উপলব্ধি করতে শিখেছে: জীবন কত মূল্যবান ও একই সঙ্গে ক্ষণস্থায়ী। করোনা পরিস্থিতির শেষ দিকে এসে পশ্চিমা দেশগুলোতে চাকরি ছাড়ার এক রকম হিড়িক পড়ে যায়। যে কাজ করতে ভালো লাগে না, যে অফিসের পরিবেশ ভালো না, যেখানে কাজ করে স্বস্তি মেলে না – কর্মীরা এমন সব চাকরি ছেড়ে দেয়ার পরিকল্পনা করে।

সম্প্রতি জল্টসের একটি জরিপে দেখা যায়, করোনার সময় যুক্তরাষ্ট্রে ১ কোটি মানুষ চাকরি ছেড়েছে। চলতি বছরেও স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দেয়া লোকের সংখ্যা ৪৬ লাখ। মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদহারের মাঝেও যেখানে চাকরি পাওয়া নিয়ে থাকার কথা হাহাকার, সেখানে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরেও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির পদ খালি ছিল ১ কোটি ৭২ লাখ, যা বিগত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।

যুক্তরাষ্ট্রে এ গণহারে চাকরি ছাড়াকে অনেকে ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’-এর সঙ্গে মিলিয়ে নাম দিয়েছেন ‘গ্রেট রেজিগনেশন’। এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদ এলিস গোল্ড বার্তা সংস্থা বিজনেস ইনসাইডারকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘কোভিডকালীন পরিস্থিতি মানুষের চিন্তাভাবনা অনেকখানি বদলে দিয়েছে। মানুষ নতুন করে ভাবতে শিখেছে তাদের জীবন ও কাজ নিয়ে। মানুষ এখন কাজের মাঝে আনন্দ খুঁজে বেড়াচ্ছে। টাকাটাই যে সব না একথা বুঝতে পেরেছে মানুষ।’

এতদিন যেখানে গ্রাহককে সবার আগে সেবা দেয়ার কথা বলতো প্রতিষ্ঠানগুলো, তারা বুঝতে পেরেছে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রাণশক্তি কর্মী না থাকলে গ্রাহকসেবার বিষয়টি বায়বীয় হয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগে না। কর্মীদের কাজে ফিরিয়ে আনতে মানবসম্পদ বিভাগের ৩০ জন কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি গবেষণা চালিয়েছে এক্স মেনিফেস্টো। গবেষণায় বলা হয়েছে, কর্মীদের জন্য এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে কর্মীরা কাজ করে আনন্দ পায়। কর্মীদের কল্যাণের কথা না ভাবলে যতই গ্রাহক সেবা দেয়া হোক প্রতিষ্ঠান টিকতে পারবে না।

সম্প্রতি প্রকাশিত গবেষণাটির মূল কয়েকটি ধারায় বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠান ও কর্মীর মধ্যে এক ধরনের মিতালির মনোভাব থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠান কর্মীকে সেবা দেবে; বিনিময়ে কর্মী প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধির জন্য যা যা করা দরকার করবে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলো কর্তৃত্বসূচক ব্যবহার থেকে বেরিয়ে এসে কর্মীদের সঙ্গে এক বন্ধুসুলভ সম্পর্ক সৃষ্টি করবে। এতে করে প্রতিষ্ঠানটিকে নিজের একটি অংশ মনে করবে কর্মীরা। প্রতিষ্ঠানকে আপন ভাবলে আপনি থেকে কাজে একাগ্রতা বাড়বে গবেষণাটিতে বলা হয়েছে।

এরই মধ্যে প্যাটাগোনিয়া, এয়ার বিএনবি ও শপিফাই-এর মতো প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন এ গবেষণালব্ধ কর্মীবান্ধব ডিজাইনকে গ্রহণ করছে। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান বলছে, কর্মীদের বেশি সুবিধা দেয়া হলে তারা পেয়ে বসবে ও অযৌক্তিক বেতন দাবি করবে। এ ব্যাপারে ব্যবসা বিশ্লেষক সামান্থা গাদ বলেন, ‘এটা হওয়ার সম্ভাবনা কম। আপনার কর্মীরা যদি স্মার্ট হয় তারা বুঝবে কত বেতন পাওয়ার যোগ্য তারা। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় নিয়েও তাদের একটি ধারণা থাকবে। একটি স্মার্ট কর্মী এমন কিছু দাবি করবে না যাতে করে তার প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়।’

কর্মীবান্ধব এ মেনিফেস্টো গ্রহণ করা কোম্পানি এয়ার-বিএনবির মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা মার্ক লেভি বলেন, ‘নতুন এ ডিজাইনটি কর্মীরা অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। পুরো প্রতিষ্ঠানে এর ছোঁয়া লেগেছে। আমরা কর্মীদের গ্রাহকদের মতো সেবা দিচ্ছি। এতে করে একদিকে কর্মীরা খুশি মনে কাজ করছে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানেরও উন্নতি হচ্ছে।’

পুরাতন সাতমহলা অট্টালিকার মতো ভেঙে পড়ছে চাকরিক্ষেত্রের পুরাতন সব সংস্কার। এতদিন কর্মীদের যাচ্ছেতাইভাবে ব্যবহার করা হলেও, করোনা-পরবর্তী সময়ে কোম্পানিগুলো বুঝতে পেরেছে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রাণ হচ্ছে তার কর্মী। তাই গ্রাহকদের পাশাপাশি কর্মীদেরও সর্বোচ্চ সুবিধা দিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার লক্ষ্যে নতুন এ মেনিফেস্টো নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে বাঘা বাঘা সব প্রতিষ্ঠান।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৪:০৩ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২২

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া
সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭। সম্পাদক কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি), মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

ফোন : ০১৯১৪৭৫৩৮৬৮

E-mail: [email protected]