সোমবার ১৫ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ২রা বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

‘রিলে ক্রপিং’ সরিষা চাষে সাফল্যের হাতছানি

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   মঙ্গলবার, ২০ ডিসেম্বর ২০২২ | প্রিন্ট

‘রিলে ক্রপিং’ সরিষা চাষে সাফল্যের হাতছানি

বরেন্দ্রভূমি খ্যাত উত্তরাঞ্চলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ‘রিলে ক্রপিং’ এর মাধ্যমে সরিষা চাষে সফল হয়েছে কৃষকেরা। অল্প সময়ের মধ্যে অধিক সরিষার উৎপাদন ও পতিত জমির যথার্থ ব্যবহারের কারণে উত্তরাঞ্চলে বেশ সাড়া ফেলেছে ‘রিলে ক্রপিং’ পদ্ধতি।

সরিষার অধিক উৎপাদন ও আবাদ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে ভোজ্য তেল সয়াবিনের পরিপূরক হিসেবেও সরিষার অফুরান সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর।

জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থ বছরে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০ হাজার ২৫০ হেক্টর। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অর্জন হয়েছে ৪৩ হাজার ৫৫০ হেক্টর। আরো দেড় থেকে দুই হাজার হেক্টর আবাদ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ অর্থ বছরে ৬৩ হাজার ৯৯৮ মেট্রিক টন উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে হেক্টর ও প্রতি গড় ফলন ধরা হয়েছে ১ দশমিক ৫৯ মেট্রিক টন। গত বছর (২০২১-২২) আবাদ হয়েছে ২৬ হাজার ১৫৬ হেক্টর। তবে উৎপাদন বেড়ে এবার ৪২ হাজার ৫৫০ হেক্টর উৎপাদন হয়েছে।

এদিকে সরকারও দেশীয়ভাবে ভোজ্য তেলের উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। দেশের মোট আবাদি জমিতে মৌসুমী আবাদ ও উৎপাদন ব্যাহত না করেই দেশের কৃষি জমিতে ‘রিলে ক্রপিং’ পদ্ধতিতে সরিষার আবাদে গুরুত্ব দিতে নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। এতে প্রায় শতকরা ৪০ ভাগ ভোজ্যতেলের আমদানি কমানো সম্ভব হবে বলেও আশা করা হচ্ছে।

রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ দফতর বলছে, রোপা ও আমনের পর সাধারণত জমি পতিত থাকে আড়াই মাস। এই সময় কর্তনকৃত ধানের জমিতে সরিষা ছিটিয়ে দেওয়া হয়। অত:পর একবার সেচ দিয়ে টপ ড্রেসিং করতে হয়। এতে পতিত জমিতেই সরিষা গাছ খুব সুন্দরভাবে বেড়ে উঠে এবং তিন থেকে চার মাসের মধ্যে পতিত জমিটি সরিষা আসে। রোপা ও আমন ধানের পর পতিত জমিতে সরিষার বীজ ছিটিয়ে সহজভাবে চাষ করার এই পদ্ধতিতেই ‘রিলে ক্রপিং’ পদ্ধতি বলে। এক্ষেত্রে বোরো ধান লাগানোর আগেই সরিষার চাষ সম্পন্ন হয়।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ দফতরের অতিরিক্ত সহকারী পরিচালক সারমিন সুলতানা জানান, রিলে ক্রপিং পদ্ধতিতে এক বিঘা জমিতে প্রায় ৫ থেকে ৭ মণ সরিষা উৎপাদন হয়। সরিষার ঔষধি গুণ রয়েছে, বর্তমানে বাজারে সয়াবিনসহ অন্যান্য ভোজ্যতেলের দাম বেশি হওয়ায় সরিষার তেলের চাহিদাও রয়েছে বেশ।

বর্তমানে রাজশাহীর কাকনহাট, ঋষিকুল, ঈশ্বরপুর, মোহনপুর, তানোর, বাঘাসহ বেশকিছু অঞ্চলে রিলে ক্রপিং পদ্ধতিতে সরিষার চাষ বেশি হচ্ছে।

তিনি আরো জানান, এক বিঘা জমিতে সার, সেচ ও অন্যান্য খরচ বাবদ মোট চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়। বর্তমানে রাজশাহীর কৃষকেরা বারি-১৪, ১৫, ১৭, ১৮ ও বিনা সরিষা-৯ জাতের সরিষা চাষ করতে বেশি উৎসাহী। এর মধ্যে বারি-১৪ ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকেরা ব্যাপক পরিমাণে চাষ করে। এই জাতের সরিষার চাহিদাও বাজারে অনেক বেশি। গাছের উচ্চতা বড় হওয়ায় জ্বালানির চাহিদাও পূরণ করে। আবার খৈলও প্রচুর পাওয়া যায়। এজাতের বীজ বাজারে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে মিলছে। এই জাতের সরিষা মাত্র ৮০ থেকে ৮৫ দিন সময় লাগে পরিপক্ক হতে। আর তাই রিলে ক্রপিং পদ্ধতিতে চাষাবাদে কৃষকরা যেমন লাভবান হবেন তেমনি দেশে ভোজ্য তেলের উৎপাদনও বৃদ্ধি পাচ্ছে বহুগুণে।

বাঘা উপজেলার মশিদপুর গ্রামের মো. নুরুজ্জামান। এ বছরে রিলে ক্রপিং এর মাধ্যমে সাত বিঘা জমিতে আবাদ করেছেন।

তিনি বলেন, এই পদ্ধতিটার বিষয়ে আগে জানতাম না। আবার আমাদের মাথাতেও আসেনি। বিঘা প্রতি আমার খরচ হয়েছে মাত্র তিন থেকে চার হাজার টাকা। সে তুলনায় এবার অনেক লাভবান হওয়ার সুযোগ হবো আশা করছি।

গোদাগাড়ী উপজেলার ঋষিকুল গ্রামের কৃষক টিপু সুলতান বলেন, তিন বিঘা জমিতে এবার আমনের সঙ্গে সরিষার বীজ ছিটিয়ে ছিলাম। ধান কাটা হয়েছে অনেক আগেই। আর বর্তমানে সরিষাতেও ফুল এসেছে। আবার আমার জমিতে মৌয়ালরা মধু সংগ্রহের জন্য বক্স লাগিয়েছে। তাতেও মিলছে আর্থিক সুবিধা। সব মিলিয়ে এক জমিতে তিন ধরনের লাভ পেয়ে বেশ ভালোই লাগছে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোজাহার উদ্দিন বলেন, রাজশাহী অঞ্চলে ‘রিলে ক্রপিং’ এর মাধ্যমে সরিষার আবাদ করে ব্যাপক লাভবান হয়েছেন কৃষকেরা। ৮০ হাজার হেক্টর আমন ধানের আবাদ হয়েছিল। ধান কাটার আগেই রিলে ক্রপিং পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে আমরা বেশ সফল। কারণ, এটিতে খুব অল্প সময়ের মধ্যে গত বছরের তুলনায় এ বছর দ্বিগুণ উৎপাদন হয়েছে। তাও খুব অল্প খরচের মাধ্যমে।

আমরা আশা করছি আগামী তিন বছরের মধ্যেই সরকার শতকরা ৪০ থেকে ৫০ ভাগ ভোজ্যতেল আমদানি কমাতে সক্ষম হবে শুধুমাত্র এই রিলে ক্রপিং এর দ্বারা। এই পদ্ধতির কারণে একটি জমি থেকে একই সময়ের মধ্যে তিন ধরনের লাভ পাচ্ছে কৃষকেরা। একই সময়ে ধান, সরিষা ও মধুর মতো চাষ করে কৃষক, দেশ তথা জনগণ উপকৃত হচ্ছে বলে দাবি এই কৃষিবিদের।

উপপরিচালক আরো জানান, এই চলতি মৌসুমেই ৫০০ থেকে ৬০০ মেট্রিক টন মধু সরিষার মাঠ থেকে আহরণ করা যাবে। এবছর মধুর উৎপাদনও বাড়বে শতকরা ২৫ ভাগ। বরেন্দ্র অঞ্চলের মাঠগুলোতে দুই থেকে তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে একশত থেকে দেড়শটি বক্স মৌয়ালরা বসিয়েছে। এতে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ২:২৯ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২০ ডিসেম্বর ২০২২

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া
সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭। সম্পাদক কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি), মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

ফোন : ০১৯১৪৭৫৩৮৬৮

E-mail: [email protected]