সোমবার ১৭ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

দুর্নীতির সব কলাকৌশল রপ্ত গাজীপুরের জাহাঙ্গীরের

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   শনিবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | প্রিন্ট

দুর্নীতির সব কলাকৌশল রপ্ত গাজীপুরের জাহাঙ্গীরের

অভিযোগের শেষ নেই গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে। দুর্নীতি-অনিয়মের অপর নাম যেন জাহাঙ্গীর আলম। জাতীয় শোক দিবসে দুস্থদের খাওয়ানোর জন্য বরাদ্দকৃত অর্থও ঢুকিয়েছেন নিজেদের পকেটে। তিনি ও তার অনুসারীরা কিছুই ছাড়েননি। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থও এর বাইরে ছিল না। জিসিসির অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনে জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির এমন অজস্র অভিযোগের বিশদ বিবরণ পাওয়া গেছে।

২০১৮ সালের ২৭ জুলাই জিসিসি মেয়র হিসেবে শপথ নেন জাহাঙ্গীর। সিটি করপোরেশন আইন ২০০৯ এর ১৩ (১) ধারায় বলা হয়েছে, এসব অপরাধের জন্য একজন মেয়রকে অপসারণ করা যেতে পারে। পরে মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত সচিব মুস্তাকিম বিল্লাহ ফারুকীকে প্রধান করে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় গঠিত একটি তদন্ত কমিটির তৈরি এ প্রতিবেদনে জাহাঙ্গীরের বিভিন্ন দুর্নীতি-অপকর্মের তথ্যসহ বিভিন্ন পর্যবেক্ষণও অন্তর্ভূক্ত হয়েছে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন গত ৩ অর্থবছরে (২০১৮-২০১৯, ২০১৯-২০২০ ও ২০২০-২০২১) ৮টি এলাকায় বর্জ্য অপসারণে ব্যয় করেছে ১২ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।

অথচ সেসব এলাকার কোনো আবর্জনা পরিষ্কার না করেই এর বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

জিসিসির তদন্ত প্রতিবেদনে বর্ণনা করা হয়েছে যে কীভাবে জাহাঙ্গীরের তত্ত্বাবধানে সব আইন উপেক্ষা করে দুর্নীতি সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছিল।

গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২১ জানুয়ারি ক্ষমতাসীন দল তাকে সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দেয়। এরপর তার ‍দুর্নীতি ও অপকর্মের বিষয়গুলো আবারও সামনে আসে।

২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর একটি ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হলে জাহাঙ্গীরকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। ভিডিওতে তাকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কটূক্তি করতে এবং মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে দেখা যায়। দল থেকে বহিষ্কারের ৭ দিন পর ২৫ নভেম্বর তাকে মেয়র পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

সে সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ভূমি দখল, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সরকারি অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগকে জাহাঙ্গীরের স্থগিতাদেশের কারণ হিসেবে উল্লেখ করে।

বর্জ্য অপসারণে দুর্নীতি

২০১৮-২০১৯, ২০১৯-২০ এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে বর্জ্য অপসারণে জিসিসি ব্যয় করেছে ১২ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।

এর মধ্যে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা এবং ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়।

কিন্তু বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ম-কানুন মানা হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভাউচারের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকার বেশি অর্থ প্রদান করা হয়েছে, যা নিয়মবহির্ভূত।

নিয়ম অনুযায়ী, ভাউচারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পরিশোধ করা যাবে।

অথচ কাগজে দেখানো হয়েছে যে, ৮টি এলাকায় ড্রেন পরিষ্কার করার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল এবং বিলগুলো যথাযথ নিয়ম মেনেই পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কোনো দরপত্র আহ্বান করা হয়নি, কোনো কমিটি গঠন হয়নি।

জিসিসির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর সবকিছুই করা হয়েছে অর্থ আত্মসাতের জন্য।

এছাড়া বিল পরিশোধ করা হলেও ওই সব এলাকায় কোনো ড্রেন পরিষ্কার করা হয়নি। এসব ওয়ার্ডের কাউন্সিলররাও এই ভৌতিক ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

মেয়রের পছন্দের নির্মাণ প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া

জিসিসিতে প্রায় ১ হাজার ২০০ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত থাকলেও ৩ অর্থবছরে মাত্র ১৬টি প্রতিষ্ঠান ১২৮ কোটি ৭১ লাখ টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই ১৬টিসহ মোট ২৩টি প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি, যা ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’।

তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ওই ২৩টি প্রতিষ্ঠানকে গোপনে কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং এগুলোর মালিকরা জাহাঙ্গীরের খুব ঘনিষ্ঠ।

কাজ হয়নি, তাও বিল পরিশোধ

তদন্ত প্রতিবেদনে বালু ভরাট, মাটি ভরাট ও রাস্তা প্রশস্তকরণের মতো বিভিন্ন ছোট ছোট উন্নয়ন কাজের মাধ্যমে জনগণের অর্থ আত্মসাতের একটি চমকপ্রদ উপায় বর্ণনা করা হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রুহুল আমিন নামের এক ব্যক্তির মালিকানাধীন এমএস এমই (জেভি) নামের একটি প্রতিষ্ঠান নয়নের দোকান থেকে টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়কের কাছে তপু মেম্বারের বাড়ি পর্যন্ত এবং জয় বাংলা রোডের সেতু থেকে মেঘডুবি বাইপাস পর্যন্ত বালু ও মাটি ভরাট এবং রাস্তা প্রশস্তকরণের জন্য ৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকার কাজ পায়।

কোম্পানিটি ২০২১ সালের ২৬ এপ্রিল দরপত্রে একক অংশগ্রহণকারী হিসেবে কাজটি পায় এবং ২০২১ সালের ৪ মে ও ২১ আগস্ট ২টি চেকে ৩ কোটি ৭ লাখ টাকার আংশিক পেমেন্ট পায়।

কিন্তু ২০২২ সালের ২৪ মে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত কমিটি ৩১ শতাংশ অর্থ প্রদানের পরও সেখানে উন্নয়ন কাজের কোনো অগ্রগতি দেখতে পায়নি।

হাট-বাজার ইজারায় অনিয়ম

জিসিসির তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৩ অর্থবছরে জিসিসির আওতাধীন ১০৪টি স্থায়ী হাট-বাজারের (উন্মুক্ত বাজার) ইজারা মূল্য ছিল ১২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

একই সময়ে একটি অস্থায়ী হাট-বাজারের ইজারা মূল্য ছিল এক কোটি ৮০ লাখ টাকা, কিন্তু করপোরেশন পেয়েছে মাত্র ৫৬ লাখ টাকা।

১৯৫৯ সালের অধ্যাদেশ অনুসারে চুক্তির টাকা পাওয়ার পরই বাংলা বছরের প্রথম দিনে ইজারাদারের কাছে হাট-বাজার হস্তান্তর করার কথা সিটি করপোরেশনের।

কিন্তু এই ৩ বছরে চুক্তির পুরো টাকা না নিয়ে ইজারাদারদের হাতে হাট-বাজার তুলে দেওয়া হয়েছে। তারা এই অর্থ পরেও পরিশোধ করেননি।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী

২০২০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে সিটি করপোরেশনের তহবিল থেকে ২ কোটি ১১ লাখ টাকা ব্যয় করেছে জিসিসি।

কিন্তু করপোরেশনের অভ্যন্তরীণ তদন্তে দেখা গেছে যে, উল্লিখিত সময়ে এই ধরনের কোনো অনুষ্ঠান হয়নি।

উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, কাগজপত্রে দেখানো হয় যে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে রাজবাড়ী মাঠে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এবং এ জন্য করপোরেশনের তহবিল থেকে অর্থ দেওয়া হয়।

কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারির কারণে আরোপিত বিধি-নিষেধের কারণে তখন উন্মুক্ত জায়গায় সব ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল এবং এ ধরনের কোনো অনুষ্ঠান সেদিন রাজবাড়ী মাঠে হয়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের জন্য তৎকালীন জিসিসি সচিব মোস্তাফিজুর রহমানের জন্য ৪৬ লাখ টাকার এবং তৎকালীন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রেজাউল বারীর জন্য ৪৫ লাখ টাকার আরেকটি চেক ইস্যু করা হয়।

কিন্তু মাস্টার রোলে থাকা জিসিসির ২ কর্মী নাজমুল ইসলাম ও সোলাইমান তাদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বর ব্যবহার করে চেকগুলো ক্যাশ করেন।

পরে রেজাউল বারী জিসিসিকে জানান, তার নামে ইস্যু করা চেকের বিষয়ে তিনি অবগত নন।

বিশ্ব ইজতেমা

বিশ্ব ইজতেমার জন্য ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে মোট ৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এরমধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা এবং ২০২০-২০২১ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।

বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে ৫টি খাতে মোট ৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়। বলা হয়, বস্তা কিনতে দেড় কোটি টাকা, নলকূপ মেরামতে এক কোটি ৩৪ লাখ টাকা, বালু ভরাট বাবদ ৫ কোটি টাকা, আতিথেয়তা বাবদ ২৪ লাখ ৩৩ হাজার টাকা এবং এলইডি লাইট কিনতে এক কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে।

কিন্তু জিসিসির তদন্তে বস্তা কেনার কোনো ভাউচার পাওয়া যায়নি। এছাড়া বালু ভরাটের জন্য বরাদ্দের চেয়ে অনেক কম ব্যয় করা হয়। আর কেবল কামারপাড়া ব্রিজ থেকে স্টেশন রোড পর্যন্ত রাস্তায় এলইডি লাইট বসানো হয়। অন্য রাস্তাগুলোতে কোনো এলইডি লাইট পাওয়া যায়নি।

আর্থিক অসঙ্গতি

২০১৮-১৯, ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে জিসিসির উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে যে ১৩৬ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে, তাতে নানা অসঙ্গতি পেয়েছে তদন্ত কমিটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ অগ্রগতি দেখিয়ে বিল পরিশোধ করা হলেও সেসব প্রকল্পে কোনো কাজ হয়নি।

আবার উন্নয়ন তহবিল থেকে রাজস্ব তহবিলে অর্থ স্থানান্তরের কোনো বিধান না থাকলেও সিটি করপোরেশন ৩ অর্থবছরে উন্নয়ন তহবিল থেকে ১০০ কোটি টাকা রাজস্ব তহবিলে স্থানান্তর করেছে।

আরও অনেক অভিযোগ সামনে আসছে

জিসিসি সূত্রে জানা যায়, গাজীপুর নগর ভবনে লিফট ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র স্থাপনে ২০২০ সালে প্রায় ৮৩ লাখ টাকা ব্যয় করেছে সিটি করপোরেশন।

কিন্তু ওই টাকায় কেনা কোনো লিফট কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র নগর ভবনে দেখা যায়নি।

এর বাইরে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে দুস্থদের খাওয়ানোর জন্য এটিএম আইডেন্টিটি নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ২৫ লাখ ও ২৬ লাখ ১৯ হাজার টাকার ২টি চেক ইস্যু করেন জাহাঙ্গীর।

কর্মকর্তারা বলছেন, একই সময়ে জিসিসির ৮ কাউন্সিলরকে ৩৫ লাখ টাকার ৮টি পৃথক চেক প্রদান করা হয়।

কিন্তু আরেক তদন্তে এসব চেকের বিপরীতে সিটি করপোরেশনের রেজিস্টারে প্রাপকদের কোনো স্বাক্ষর পায়নি।

এ কারণে সিটি করপোরেশন সম্প্রতি ৮ কাউন্সিলরসহ যে কোম্পানির বিরুদ্ধে এই চেকগুলো ইস্যু করা হয়েছে, তাদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে ব্যয়ের ভাউচারের বিবরণ জমা দিতে বলেছে।

জিসিসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাষ্য, ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাদের কারও কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

তদন্ত শুরু

২০২২ সালের ১৫ জুন স্থানীয় সরকার বিভাগের (এলজিডি) উপসচিব ও তদন্ত কমিটির সদস্য মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি পাঠান। আবদুস সাত্তার মোল্লা নামের এক ব্যক্তি এই অভিযোগ করেন।

চিঠিতে এলজিইডি উল্লেখ করে, ‘অভিযোগে আপনাকে (জাহাঙ্গীর) বিদেশে অর্থ পাচারকারী, দুর্নীতিবাজ এবং বিভিন্ন অনিয়মের মূল হোতা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।’

জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের এসব অভিযোগের মধ্যে আছে- ভুয়া টেন্ডারের মাধ্যমে ৪২ কোটি টাকা, মস্টার রোলের আওতায় ৫০০ ট্রাফিক সহকারী নিয়োগ দিয়ে কোটি কোটি টাকা এবং বিশ্ব ইজতেমায় ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা আত্মসাৎ।

২০২২ সালের ২৯ জুন উপসচিব জহিরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত আরেকটি চিঠিতে জাহাঙ্গীরকে ওই বছরের ২০ জুলাইয়ের মধ্যে দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়।

দুদকের তদন্ত

জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার পর দুদক বিষয়টি তদন্ত শুরু করে। এই তদন্ত দলের সদস্য সংস্থাটির উপপরিচালক আলী আকবর ২০২২ সালের ১ সেপ্টেম্বর পাঠানো এক চিঠিতে ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জাহাঙ্গীরের ব্যাংক হিসাব ও লেনদেনের সব তথ্য জমা দিতে বলেন।

জাহাঙ্গীরকে পাঠানো দুদকের চিঠিতে বলা হয়, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে লেনদেনের অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য তাকে এসব তথ্য দিতে বলেছে দুদক।

একই দিন আলী আকবর বিশ্ব ইজতেমা মাঠে বালু ভরাট, লাইট স্থাপন, জিসিসি পরিচালিত হাট-বাজার থেকে রাজস্ব আদায় এবং ২০১৮-১৯ সালের দরপত্র আহ্বানের বিবরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে রেকর্ড ও তথ্য পাঠাতে জিসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে চিঠি দেন।

ডেইলি স্টারের হাতে এই চিঠিগুলোর অনুলিপি আছে।

আলী আকবরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে জানান, গাজীপুরের সাবেক মেয়রের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বেশ কিছু অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে।

তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে এই দুদক কর্মকর্তার বক্তব্য, ‘আমরা এখন প্রতিটি তথ্য যাচাই করে দেখছি। আমরা আশাবাদী যে এসব অনিয়মের ব্যাপারে আমরা জাহঙ্গীরের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনতে সক্ষম হব।’

‘আমি প্রতারণার শিকার’

জাহাঙ্গীর আলম তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে এসব ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতারণার শিকার। কেউ আমার পরিচয় ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব খুলে দাবি করেছে যে আমি ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো… এমনকি আমি ব্যাংকেও যাইনি।’

অন্য অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গত ১৪ মাস ধরে নিয়ম অমান্য করে মেয়র পদে থাকা একজন কাউন্সিলর সিটি করপোরেশনের কিছু কাগজপত্র জাল করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশের চেষ্টা করছেন। এ জন্য তিনি টাকাও খরচ করছেন।’

এর বাইরে জাহাঙ্গীর সড়ক নির্মাণে টেন্ডার কারসাজি ও অনিয়মের জন্য সিটি করপোরেশনের কয়েকজন কর্মকর্তাকে দোষারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হই, তাহলে জিসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও ম্যাজিস্ট্রেটকেও দুর্নীতিগ্রস্ত হতে হবে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কেউ কোনো প্রশ্ন তোলেনি।’

সড়কের কাজের অগ্রগতি মেয়রের বোঝার কথা নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়নি, তাদের বেতন কাটা হয়নি।’

তদন্ত কমিটি গঠনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জাহাঙ্গীর বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের জন্য প্রথমে সিটি করপোরেশনে আসতে হবে। সিটি করপোরেশন যদি অভিযোগের নিষ্পত্তি না করে, তাহলে মন্ত্রণালয় তদন্তের নির্দেশ দিতে পারে।’

যারা এসব অভিযোগ করেছেন তারাই বা কেমন- সেটাও কেউ যাচাই করে দেখেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল, কিন্তু কিসের ভিত্তিতে? কোনো তদন্ত ছাড়াই আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

মেয়র পদ ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা সম্পর্কে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমি সরকারের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়েছি এবং মন্ত্রীও আমাকে বলেছেন যে এটি আমাকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।’

যোগাযোগ করা হলে সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণ বলেন, ‘জাহাঙ্গীরের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। গাজীপুর সিটি করপোরেশন কেবল কাগজপত্র সরবরাহ করেছে।’

এদিকে দলের পক্ষ থেকে সাধারণ ক্ষমা পাওয়ার পর জাহাঙ্গীরের অনুসারীরা উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েছেন। দলের ভেতরকার সূত্রগুলো বলছে, তারা এখন জাহাঙ্গীরের মেয়র পদ পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন।

তবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেছেন, মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপরেই নির্ভর করছে এ সিদ্ধান্ত।

গত সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর আমরা তা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেব।’

এ ব্যাপারে কথা বলতে তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত সচিব ফারুকীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি এই ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তদন্ত কমিটির সদস্য মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম জানান, কমিটি এখনো মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়নি। তিনি বলেন, ‘আমরা গাজীপুর সিটি করপোরেশনকে বিভিন্ন কাগজপত্র জমা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলাম। এখন আমরা সেই নথিগুলো বিশ্লেষণ করছি। আমরা শিগগিরই প্রতিবেদন তৈরির কাজ শেষ করব।’

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করছে।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৩:১৫ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া
সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭। সম্পাদক কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি), মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

ফোন : ০১৯১৪৭৫৩৮৬৮

E-mail: [email protected]