মঙ্গলবার ১৮ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বঙ্গবন্ধুর ডাকে ঘরে বসে থাকতে পারেননি গৌর গোপাল

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বৃহস্পতিবার, ১৬ মার্চ ২০২৩ | প্রিন্ট

বঙ্গবন্ধুর ডাকে ঘরে বসে থাকতে পারেননি গৌর গোপাল

বগুড়ার ধুনট উপজেলার সুরুগ্রাম ছিল রাজাকার-আলবদরে ভরা। মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে অমানবিক নির্যাতন করে হত্যা করতো তারা। কিংবা তুলে দিতো পাক বাহিনীর হাতে। স্বাধীনতার বিপক্ষে পুরোদমে কাজ করে যাচ্ছিলো এই গ্রামের রাজাকার-আলবদররা। গ্রামটিকে রাজাকারমুক্ত করতে ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আসে মুক্তিযোদ্ধাদের দুইটি দল।

ভারত থেকে প্রশিক্ষণ শেষে ধুনটের উদ্দেশ্যে তিনটি নৌকা নিয়ে রওনা দেন তারা। মুক্তিযোদ্ধা দল দুটির কমান্ডার ছিলেন মাসুদুল আলম খান চান্দু এবং আব্দুস সবুর সওদাগর। চান্দুর দলে ছিলেন ২০ বছরের তরুণ পোস্টমাস্টার বগুড়ার গৌর গোপাল গোস্বামী। যুদ্ধে বগুড়ার বীর সন্তান মাসুদুল আলম খান চান্দু শহীদ হলেও বেঁচে আছেন গৌরগোপাল গোস্বামী। তার মুখেই শোনা যায় মুক্তিবাহিনীর বীরত্বগাথা।

গোপাল জানান, ভারতের সীমান্তবর্তী হিলিতে সফল অভিযান শেষে ভারতের আসামের মাইনকারচর হয়ে বাংলাদেশে আসেন তারা। তাদের দল পরদিন সকালে গাইবান্ধার ফুলছড়ি ঘাটে পৌঁছায়। এখানেই ঘটে বিপত্তি। দূর থেকে ভেসে আসে এক অচেনা বৃদ্ধের চিৎকার।

বৃদ্ধ বলছিলেন, ‘সামনে মিলিটারি, সাবধান।’ তখনই তিনটি নৌকা ওই চরেই ভেড়ান মুক্তিযোদ্ধারা। নৌকাগুলো সেখানেই আড়ালে রেখে অবস্থান করেন তারা। এর মিনিট বিশেক পরে তাদের চোখে পড়ল পাকবাহিনীর স্পিডবোট। সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধারা মাটিতে শুয়ে পড়ে হানাদার বাহিনীর নজর এড়ালেন।

বৃদ্ধের সতর্ক বার্তায় সেবারের মতো প্রাণে বেঁচে গেলেন সবাই। নয়তো ভয়ানক কিছু হয়ে যেত সেদিনই। ওই দিন রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করলেন মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা। যে যার মতো লুকিয়ে ছিলেন। রাতে পাকবাহিনী সার্চ লাইট দিয়ে আবারো নজরদারি শুরু করে। তবে সার্চ লাইট খুঁজে বের করতে পারেনি মুক্তিযোদ্ধাদের। পাক বাহিনীর নজর এড়িয়ে রাতেই ধুনটের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় মুক্তিবাহিনীর দল দুটি।

যমুনা নদী পার হয়ে বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার চন্দনবাইশা নামক এলাকায় আশ্রয় নেন গৌর গোপালরা। পরে তারা কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে ধুনট উপজেলার নিমগাছী, শাজাহানপুর উপজেলার খোট্টাপাড়া ও জালশুকাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো রাজাকার-আলবদর মুক্ত হয়।

দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। মুক্তিযোদ্ধার দলটি অবস্থান নিয়েছে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বালিয়াদীঘি গ্রামে। সেখানে এসেই তারা জানতে পারেন ওই উপজেলার দড়িপাড়া গ্রামের শমসের রাজাকার বাহিনী একজন মুক্তিযোদ্ধাকে ধরে নিয়ে গেছে। সেখানে তাকে মিলিটারিদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। এমন সংবাদ পাওয়া মাত্রই টিম লিডার মাসুদুল আলম খান চান্দুর নেতৃত্বে দড়িপাড়া গ্রামে অপারেশন চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

ঐদিন রাতে দড়িপাড়া উদ্দেশ্যে রওনা দেয় মুক্তিযোদ্ধারা। রাজাকারদের আস্তানার কাছাকাছি পৌঁছাতেই একজন মুক্তিযোদ্ধার রাইফেল থেকে অসাবধানতাবশত একটি গুলি বেরিয়ে যায়। গুলির শব্দ শুনে সতর্ক হয়ে যায় রাজাকার শমসের বাহিনী। তারাও শুরু করে পাল্টা গুলি ছোঁড়া। মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারদের মধ্যে শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ।

একপর্যায়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা চান্দু বুকে গুলিবিদ্ধ হন। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন বামপাশের যোদ্ধা গৌর গোপাল।

চান্দু তখন ইশারায় টিমের সদস্যদের উদ্দেশ্যে করে বলেন, ‘তোমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাও, আমাকে ছেড়ে দাও।’ এর পরপরই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন চান্দু। পরে প্রায় দুই-তিন ঘণ্টা রাজাকার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে আটক মুক্তিযোদ্ধাকে উদ্ধার করা হয়। পরে চান্দুর মরদেহ নৌকায় তুলে চাদর দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। ভোরে শহিদ চান্দুর ভাইয়ের কাছে তার মৃতদেহ হস্তান্তর করা হয়। এ যুদ্ধে দুইজন রাজাকারও মারা যায়।

পরদিন বিকেলে শত শত মিলিটারি চলে আসে দড়িপাড়া গ্রামে। চারদিকে শুধু গুলির শব্দ। তৎক্ষণিক নেয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্রামের ভেতর দিয়ে হেঁটে ধুনটের সুরুগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেন মুক্তিযোদ্ধারা। কারণ নৌকায় গেলে পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার আশঙ্কা ছিল। পরে সুযোগমত দফায় দফায় অভিযান চালিয়ে সুরুগ্রামে রাজাকার-আলবদর মুক্ত করেন গৌর গোপালসহ অন্যরা।

ডেইলি বাংলাদেশের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় মুক্তিযুদ্ধকালীন কিছু স্মরণীয় ঘটনা এইভাবেই বর্ণনা করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত পোস্ট মাস্টার গৌর গোপাল গোস্বামী। বর্তমানে তার বয়স ৭২ বছর। তিনি বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। বর্তমানে তিনি সপরিবারে বগুড়া কাহালু উপজেলায় বসবাস করছেন। তার বাবা মৃত বিনয় গোস্বামী। মা মৃত স্নেহলতা গোস্বামী।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডাকে ঘরে বসে থাকতে পারেননি গৌর গোপাল। যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে বাইসাইকেল চালিয়ে জুলাই মাসের শুরু দিকে বগুড়ার মাদলা এলাকা থেকে ভারতের বালুরঘাটে যান। যাত্রাপথে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় একরাত বিশ্রাম নেন তিনি।

বালুরঘাটে পৌঁছানোর পর সেখানে তার এক আত্মীয়র বাড়িতে কয়েকদিন অবস্থান করেন। যুদ্ধের মূল প্রশিক্ষণ (অস্ত্র প্রশিক্ষণ) নেয়ার আগে দুই রিক্রডিং ক্যাম্পে ১৫-২০ দিন থাকতে হয়। এর অংশ হিসেবে তিনি প্রথমে ভারতের কুরমাইল ক্যাম্পে ১০-১২ দিন, পরে পতিরাম ক্যাম্প আরো ৭-৮ দিন ছিলেন। পরে তাকে পাঠনো হয় শিলিগুড়ির পানিহাটা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। সেখানে তিনি ২৮ দিনের অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেন। ওই ক্যাম্পে তিনিসহ প্রায় ৩০০ জন অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নেন। এই প্রশিক্ষণ শেষে ২৪ জন করে একটি টিম গঠন করে দেয়া হয়। গৌর গোপালের টিম লিডার ছিলেন মাসুদুল আলম খান চান্দু।

পরে তাদেরকে প্রথমে পাঠানো হয় ভারতের রায়গঞ্জ তরঙ্গপুরে। সেখানে হিলি সীমান্তে তাদেরকে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে রেললাইন (তিন কিলোমিটার) উড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়। তারা তা করতে সফল হন। এই অপারেশনের কিছুদিন পর প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের অস্ত্র-গুলি ও গ্রেনেড বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে ছেড়ে দেয়া হয়। তাদের প্রত্যেককে ৫০ রুপি ও ৬০ টাকা দেয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে গৌর গোপালসহ মুক্তিযোদ্ধাদের দুই টিম বগুড়া ধুনট উপজেলার সুরুগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ওই গ্রামের অধিকাংশ মানুষই পাকবাহিনীর পক্ষে কাজ করছিল। গ্রামের মানুষেরা মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করত। অনেক মানুষকে তারা হত্যাও করেছে। সেখানে পাক বাহিনীর কোনো ক্যাম্প না থাকলেও রাজাকার-আলবদর বাহিনী ছিল।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৪:৩৫ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৬ মার্চ ২০২৩

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া
সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭। সম্পাদক কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি), মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

ফোন : ০১৯১৪৭৫৩৮৬৮

E-mail: [email protected]