বুধবার ১৯শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

এখনো অধরা সিনেমার কায়দায় পালিয়ে যাওয়া অমৃতপাল সিং

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   সোমবার, ২০ মার্চ ২০২৩ | প্রিন্ট

এখনো অধরা সিনেমার কায়দায় পালিয়ে যাওয়া অমৃতপাল সিং
ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদী খালিস্তানি আন্দোলনের সমর্থক এক নেতাকে আটক করার জন্য পাঞ্জাবসহ দেশজুড়ে ব্যাপক অভিযান চালানো হলেও ৪৮ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তিনি পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ‘ওয়ারিস দা পাঞ্জাব’ গোষ্ঠীর প্রধান অমৃতপাল সিংয়ের খোঁজে পাঞ্জাব তো বটেই, হরিয়ানা ও হিমাচল প্রদেশসহ আশপাশের রাজ্যগুলোতেও অভিযান চলছে। পাশাপাশি গোটা এলাকাতেই মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা, এমনকি এসএমএস সার্ভিস পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে।

৩০ বছর বয়সী অমৃতপাল সিং শিখদের জন্য একটি পৃথক মাতৃভূমির দাবিতে খালিস্তানি আন্দোলনের একজন কঠোর সমর্থক। তার গাড়িবহরকে পুলিশ গত শনিবার বিকেলে জলন্ধরের কাছে শাহকোটে আটকেছিল। কিন্তু একপাশে গ্রামের সরু রাস্তা দিয়ে তিনি গাঢাকা দেন। এখনো পুলিশ তাকে ধরতে পারেনি।

ইতিমধ্যে ওই শিখ নেতার শতাধিক অনুগামীকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে অমৃতপাল সিংয়ের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা ও আর্থিক মদতদাতা দলজিৎ সিং কালসিও রয়েছেন।

ওই খালিস্তানি নেতার চারজন ঘনিষ্ঠ সঙ্গীকে আটক করে বিমানবাহিনীর বিশেষ বিমানে দেশের অন্য প্রান্তে নিয়ে গিয়ে আসামের ডিব্রুগড়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় মোড়া একটি কারাগারে রাখা হয়েছে। এই চারজনের বিরুদ্ধেই ভারতের অত্যন্ত কঠোর জাতীয় নিরাপত্তা আইনে অভিযোগ আনা হয়েছে।

এদিকে অমৃতপাল সিংয়ের বিরুদ্ধে এই অভিযানের প্রতিবাদ জানাতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিভিন্ন খালিস্তানি সংগঠন লন্ডনে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের সামনে রবিবার বিক্ষোভ দেখায়। বিক্ষোভকারীরা দূতাবাস ভবন থেকে ভারতের তেরঙা জাতীয় পতাকাও টেনে নামিয়ে ফেলেন। এ ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে রবিবার রাতেই ভারতে নিযুক্ত সর্বোচ্চ ব্রিটিশ কূটনীতিককে তলব করা হয়েছে। লন্ডনের হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ভারত জোরালো দাবিও জানিয়েছে।

যেভাবে পালালেন অমৃতপাল
পৃথক খালিস্তানের সমর্থনে বিবৃতি দিয়ে সম্প্রতি প্রচারের আলোয় আসা অমৃতপাল সিং গত শনিবার পাঞ্জাবের বার্নালায় একটি ধর্মীয় সমাবশে যোগ দিতে অমৃতসরের কাছে জাল্লু খেরা গ্রামে তার বাড়ি থেকে রওনা দিয়েছিলেন। সেদিনই বিকেলের দিকে জলন্ধরের কাছে শাহকোটে তার বিরাট গাড়িবহরকে আটকায় পাঞ্জাব পুলিশ। বিশাল বাহিনী নিয়ে তারা অমৃতপাল সিংকে ধরার জন্যই সেখানে অপেক্ষা করছিল।

অমৃতপাল সিং নিজে ছিলেন একটি মার্সিডিজে। বিপদ আঁচ করে সেই মার্সিডিজটি ও গাড়িবহরের আরো দুটি ফোর্ড এনডিএভার দ্রুত ইউটার্ন নিয়ে হাইওয়ে থেকে গ্রামের সরু রাস্তায় নেমে যায়। পুলিশও সঙ্গে সঙ্গে তাদের তাড়া করে। প্রায় হিন্দি সিনেমার কায়দায় একটানা ১৫-১৬ কিলোমিটার ধরে চলে সেই রুদ্ধশ্বাস ‘কার চেজ’। অবেশেষে মেহাতপুর শহরের একটি ব্যস্ত বাজার এলাকায় এনডিএভার গাড়ি দুটি থেমে গেলে পুলিশ সেই গাড়ির আরোহীদের গ্রেপ্তার করে।

কিন্তু অমৃতপাল সিং যে মার্সিডিজে ছিলেন সেটি চালাচ্ছিলেন তার চাচা হরজিৎ সিং। পুলিশের গাড়ি যখন তাদের ধাওয়া করছে, তখনই এক ফাঁকে তিনি অমৃতপালকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেন। অমৃতপাল সিং অন্য একটি কালো রঙের ইসুজু গাড়িতে চেপে গাঢাকা দেন। সেই গাড়িটি পরে মেহাতপুরের কাছে সালেমান গ্রামে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে।

রবিবার রাতে অমৃতপালের চাচা হরজিৎ সিং ও তার নিজস্ব গাড়িচালক হরপ্রীত সিং মেহাতপুর থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। পুলিশ আটক করে সেই মার্সিডিজ গাড়িটিও। কিন্তু অভিযান শুরুর পর পুরো দুই দিন কেটে গেলেও অমৃতপাল সিং এখনো অধরাই রয়ে গেছেন।

সরকার যা বলছে
ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভিযান নিয়ে এখনো মুখ না খুললেও ভারতের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পাঞ্জাবে আম আদমি পার্টি সরকারের পুলিশ এবং কেন্দ্রের নিরাপত্তা বাহিনী একযোগেই এই অভিযান চালাচ্ছে।

তারা আরো বলছে, দিন কয়েক আগেই পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ভগওয়ন্ত মানের সঙ্গে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত সিংয়ের একান্ত বৈঠকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে দেশবিরোধী কার্যকলাপে অভিযুক্ত অমৃতপাল সিংকে গ্রেপ্তার করা হবে। কিন্তু ঠিক তখনই যেহেতু দিল্লিতে ভারত জি২০ জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক আয়োজন করছিল, তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে গ্রেপ্তারি অভিযান চালানো হবে সেই সব বৈঠক মিটে যাওয়ার পর।

তিন সপ্তাহ আগেই অমৃতপাল সিংয়ের শত শত সমর্থক তার এক ঘনিষ্ঠ সঙ্গীকে পুলিশি হেফাজত থেকে ছাড়িয়ে আনতে পাঞ্জাবের আজনালা থানায় তরবারি ও বন্দুক নিয়ে সশস্ত্র হামলা চালিয়েছিল। পুলিশের ওপর সেই সহিংস হামলার ভিডিও নিমেষে ভাইরাল হয় গোটা ভারতে। তারও আগে থেকেই অমৃতপাল সিং অবশ্য কেন্দ্র ও পাঞ্জাবের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রাডারে ছিলেন। এখন তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি অভিযান শুরু হওয়ার পর ভারতের গোয়েন্দা সূত্রগুলো দাবি করছে, অমৃতপাল সিংয়ের সঙ্গে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের ঘনিষ্ঠ যোগসাজশ আছে।

গত ৪৮ ঘণ্টার অভিযানে খালিস্তান সমর্থক ওই নেতার বিভিন্ন ডেরা থেকে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে বলেও পুলিশ দাবি করছে, যেগুলো ‘আনন্দপুর খালসা ফ্রন্ট’ বা একেএফ নামে একটি সংগঠনের নামে জড়ো করা হচ্ছিল বলে তারা জানিয়েছে।

অমৃতপাল সিংয়ের ঘনিষ্ঠ অনুচরদের যেভাবে বিমানবাহিনীর বিমানে বিজেপিশাসিত আসামে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাতে এটাও স্পষ্ট যে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এখানে আম আদমি পার্টির (যারা পাঞ্জাবের শাসক দল) মতো বিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে হাত মিলিয়েই কাজ করছে।

তুলকালাম লন্ডনেও
এদিকে ভারতে যখন অমৃতপাল সিংকে আটক করতে অভিযান চলছে, তখন রবিবার দুপুরের পর থেকেই ব্রিটেনের বিভিন্ন খালিস্তানপন্থী সংগঠন এর প্রতিবাদ জানাতে লন্ডনে ভারতীয় হাইকমিশনের সামনে সমবেত হয়।

পরে সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, ‘খালিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগানের মধ্যেই একজন বিক্ষোভকারী প্রায় বিনা বাধাতেই দূতাবাসের মূল প্রবেশপথে টাঙিয়ে রাখা জাতীয় পতাকার রড বেয়ে উঠে যান এবং তেরঙা পতাকাটি টেনে নামিয়ে আনেন।

ভারত এ ঘটনায় যথারীতি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছে। রবিবার দিল্লিতে স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ১০টার দিকে তারা ভারতে নিযুক্ত ব্রিটিশ ডেপুটি হাইকমিশনার ক্রিস্টিয়ানা স্কটকে ডেকে পাঠিয়ে এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়। ডেপুটি হাইকমিশনারকে ডেকে পাঠানোর কারণ ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত অ্যালেক্স এলিস তখন দিল্লি থেকে দূরে ছিলেন।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৫:৪৮ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২০ মার্চ ২০২৩

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

(265 বার পঠিত)
(208 বার পঠিত)
advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া
সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭। সম্পাদক কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি), মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

ফোন : ০১৯১৪৭৫৩৮৬৮

E-mail: [email protected]