মঙ্গলবার ২৫শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বাংলা নববর্ষ উদযাপনের শুরু কবে?

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   শুক্রবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৩ | প্রিন্ট

বাংলা নববর্ষ উদযাপনের শুরু কবে?

বাংলা নববর্ষ উদযাপনের দিন পহেলা বৈশাখ, কোটি বাঙালির কাছে দিনটি প্রাণের উৎসব হিসেবেই ধরা দেয়। এই দিনে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একত্রিত হন নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে। এটি সর্বজনীন এক জাতীয় উৎসব। বাংলা বর্ষবরণের মাধ্যমে বাঙালি যেন এদিন তার শেকড়ে ফিরে যায়। প্রাণের আবেগ আর ভালোবাসায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এই দিন। বাংলা নববর্ষের ইতিহাস, জীবনে এর প্রভাব এবং পহেলা বৈশাখের চেতনার কথা জানব আজ।

বাংলা নববর্ষ উদযাপনের উৎপত্তি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর এক সাক্ষাৎকারে সমকালকে বলেন, ‘পহেলা বৈশাখের উৎপত্তি নিয়ে একটি লোক-ধারণা ও বিশ্বাস আছে। ওই লোক-ধারণা এবং বিশ্বাসের উপরই মূলত আমাদের এই বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন প্রতিষ্ঠিত। সরকারি কাগজপত্রে বা আমাদের ব্যবহারিক জীবনে বাংলা সনকে শিক্ষিত মানুষ খুব একটা গুরুত্ব দেন না। কিন্তু গ্রামীণ মানুষ, যারা তথাকথিত শিক্ষিত নন, তারা কিন্তু এই সনকে লালন করেন।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, মোঘল সম্রাট আকবর বাংলা সন প্রতিষ্ঠা করেন। মুঘল, পাঠান, সুলতান— এরা প্রত্যেকেই এসেছেন ভারতবর্ষের বাইরে আফগানিস্তান থেকে। তারা ভারতবর্ষের জলবায়ু সম্পর্কে জানতেন না। আফগানিস্তানের আশেপাশে ফার্সি সংস্কৃতির প্রভাব ছিল। সে কারণে দিনপঞ্জিকা হিসেবে ওই শাসকদের ফার্সি ক্যালেন্ডার উদ্বুদ্ধ করে। তাদের শাসনামলে ফার্সি ছিল রাজাদের প্রচলিত বা অনুশ্রিত দিনপঞ্জিকা। আর ইসলাম প্রসারের পর যেহেতু এইসব শাসনামল শুরু হয়, তাই তারা হিজরি সন এই অঞ্চলে প্রচলন করেন। হিজরি সনটি মূলত চান্দ্রবর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ চাঁদ উঠলে হিজরি সন কিংবা মাস শুরু হতো।

মুঘল সম্রাট আকবর তার শাসনামলে এসে বুঝলেন, ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের হিজরি সন বুঝতে সমস্যা হচ্ছে। তার লোকজন যখন প্রজাদের কাছে খাজনা তুলতে যাচ্ছে তখন তারা বুঝতে পারছে না। প্রজাদের এই অবস্থা দেখে একটি মডেল প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন তিনি। ভারতবর্ষে তখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক ধর্মগোষ্ঠী। আকবর সবাইকে এক জায়গায় আনতে দ্বীন-ই-ইলাহী বলে একটি ধর্মমত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলেন। সেই সঙ্গে তিনি একটি দিনপঞ্জিকা প্রতিষ্ঠারও উদ্যোগ নিলেন। কিন্তু ভারত আয়তনে অনেক বড়, সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও ছিল নানা বৈচিত্র্য। এ কারণে এসব প্রতিষ্ঠা করা বেশ কঠিন ছিল। বিভিন্ন জায়গায় এই দিনপঞ্জিকা ঠিকমতো প্রতিষ্ঠিত না হলেও বাংলার মানুষ এটি গ্রহণ করল দ্রুত। বাঙালির অন্যতম একটা বৈশিষ্ট্য হল তারা যা গ্রহণ করে তা হৃদয় থেকে করে। আন্তরিকতার সঙ্গে, অনুষ্ঠান করে গ্রহণ করে। সেটার সঙ্গে তারা আচার, লোকাচার, ধর্ম-সবই যুক্ত করল।’

বাংলা নববর্ষ উদযাপনের শুরু কবে

বৈশাখ উদযাপনের ধারণা কিন্তু বেশিদিন আগের না। এটি এসেছে একটি প্রতিক্রিয়া থেকে। ইংরেজরা যখন এলো, তখনও আমাদের ঐতিহ্যগত বিষয় ছিল চৈত্র সংক্রান্তি। চৈত্র মাসের শেষের দিনের পরে মেলা হতো। কোনো কোনো মেলা একমাস হতো। ৫০ কিংবা ৭৫ বছর আগের ইতিহাসেও এতো ঘটা করে পহেলা বৈশাখ উদযাপন ছিল না। ইংরেজ আমলের শেষ দিকে বাঙালিদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া জন্ম নিল। ইংরেজরা থার্টি ফার্স্ট নাইটের পরের প্রহর অর্থাৎ নিউ ইয়ারে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হৈ হুল্লোড়, পার্টি ইত্যাদি করে নতুন বছরকে স্বাগত জানায়। এটি নানাভাবে আমাদের নাগরিক সমাজকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে, বাঙালির মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা গড়ে তোলে। তারা ভাবে আমাদেরও তো একটা ক্যালেন্ডার আছে। আমরা কেন পহেলা বৈশাখ উদযাপন করবো না! এ কারণে চৈত্র সংক্রান্তির পাশাপাশি পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হলো।

পাকিস্তান আমলে ছায়ানট পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু করে। কারণ ইংরেজরা চলে যাওয়ার পর পাকিস্তান আমলে বাঙালি আরও চাপের মুখে পড়ে। তখন তারা ভাবলো, পহেলা বৈশাখ উদযাপন করবো। কারণ এটা আমাদের অস্তিত্ব। সেই ভাবনা থেকে ভোরবেলায় ছায়ানট বটতলায় নববর্ষ উদযাপনের আয়োজন শুরু করল। সৌরবর্ষ অনুযায়ী, ভোরবেলাতেই বঙ্গাব্দ শুরু। এ কারণে ছায়ানট ভোরবেলায় পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু করে। ছায়ানট এই আয়োজন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করে বটে, কিন্তু গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে এটা আগে থেকেই হতো। এভাবেই দীর্ঘদিন ধরে বর্ষবরণের চর্চা চলে আসছে।

এরশাদ সরকারের আমলে আমাদের ক্যালেন্ডার পাল্টে দেওয়া হল। বলা হল, পশ্চিমবঙ্গের ক্যালেন্ডার অনুসারে কেন আমরা পহেলা বৈশাখ উদযাপন করবো? আমাদের আলাদা ক্যালেন্ডার থাকবে। তৎকালীন সরকার ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ ঠিক করে দিল।

একটা স্বাধীন সার্বভৌম দিনপঞ্জিকা যেখানে ক্ষয়, বৃদ্ধি ছিল অর্থাৎ ইংরেজি বা গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এখানে ২৯, ৩০, ৩১, ৩২ দিন ছিল সেটা একটা সময়সীমায় আটকে দেয়া হল। একটা জীবন্ত ক্যালেন্ডারটাকে মেরে ফেলা হল। খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডারে যখন ১৪ এপ্রিল আসবে তখন আমাদের পহেলা বৈশাখ হবে— এটা ঠিক করে দেয়া হলো।

অন্য কোনো দেশের বর্ষবরণের সঙ্গে পহেলা বৈশাখের যোগসূত্র আছে কি

অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর বলেন, ‘একটা সময় পহেলা অগ্রহায়ণই আজকের পহেলা বৈশাখ ছিল। কারণ ওটা দিয়েই বছর শুরু হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে এটা বৈশাখে রূপান্তরিত হয়। ওই সময় আদিবাসী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরও দিনপঞ্জিকা ব্যবহার শুরু হয়। একইভাবে চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডসহ এই অঞ্চলে দিনপঞ্জিকা ব্যবহার শুরু হয়। আসলে এইসব মানুষের একসময় যোগাযোগও ছিল। এটা কৃষি নির্ভর ও ফসলের সঙ্গে যুক্ত। উপমহাদেশের সঙ্গে সাগর পথে বাণিজ্য হতো। সব মিলিয়ে একসময় উপমহাদেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতকি একটা যোগসূত্র ছিল। এ কারণেই উৎসবগুলো সমসাময়িক সময়ে গড়ে উঠতে পারে।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৮:৫৩ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৩

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া
সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭। সম্পাদক কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি), মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

ফোন : ০১৯১৪৭৫৩৮৬৮

E-mail: [email protected]