রবিবার ২১শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

‘শ্রেষ্ঠ ভিক্ষা’

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বৃহস্পতিবার, ০৪ মে ২০২৩ | প্রিন্ট

‘শ্রেষ্ঠ ভিক্ষা’

“প্রভু বুদ্ধ লাগি আমি ভিক্ষা মাগি,
ওগো পুরবাসী, কে রয়েছে জাগি…”
“ওগো পৌরজন, করো অবধান,
ভিক্ষুশ্রেষ্ঠ তিনি বুদ্ধ ভগবান,
দেহো তাঁরে নিজ সর্বশ্রেষ্ঠ দান
যতনে।” – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভিক্ষু ‘অনাথপিণ্ডদ’ নামে গৌতমবুদ্ধের একজন প্রধান শিষ্য ছিলেন। একবার তিনি বুদ্ধের নির্দেশে ভিক্ষা চাইতে শ্রাবস্তীর রাজপথে বের হলেন। সবাইকে আহ্বান করলেন নিজেদের সর্বশ্রেষ্ঠ বস্তুটি বুদ্ধের উদ্দেশ্যে দান করতে। তাঁর আহ্বানে ধনী, বণিক, রাজা, প্রজা নির্বিশেষে সবাই অকাতরে নিজেদের মনিকাঞ্চন, কন্ঠহার ইত্যাদি নিয়ে এলো। কিন্তু অনাথপিণ্ডদ কারো কাছ থেকে কিছুই গ্রহণ করলেন না। গ্রহণ করলেন মাটিতে শুয়ে থাকা এক দরিদ্র দীনহীন নারীর দান। বনের আড়ালে গিয়ে এই নারী নিজেকে লুকিয়ে হাত বাড়িয়ে নিজের পরনের কাপড় খুলে অনাথপিন্ডদকে দিল। অনাথপিন্ডদ এই দানকেই গ্রহণ করলেন শ্রেষ্ঠ ভিক্ষা হিসেবে।

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কথা’ কাব্য। এতে আটটি কবিতা আছে। সবগুলোই রচিত হয়েছে বৌদ্ধ কাহিনী অবলম্বনে। কাব্যের প্রথম কবিতার নাম ‘শ্রেষ্ঠ ভিক্ষা’। এই কবিতায় এভাবেই কবি জয়গান করেছেন এক অতি দরিদ্র নারীর। যে নারী তার একমাত্র বসন দান করে দেয় বুদ্ধের নামে।

আরেকটু প্রসঙ্গান্তরে যাই। বোধি লাভের পূর্বে গৃহত্যাগী গৌতম গৃধ্রকূট পাহাড়ে সঙ্গীদের সঙ্গে কঠোর তপস্যা শুরু করেন। তপস্যার প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি ঘাস, শ্যাওলা ইত্যাদি খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করতেন। কাঁটার শয্যায় ঘুমাতেন। গাছের বল্কল পরে লজ্জা নিবারণ করতেন। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় তার শরীর হয়ে গিয়েছিলো কৃশ। মেরুদণ্ড রূপ ধারণ করেছিলো সুতোর গুটির। তাঁর পেটের চামড়ায় হাত দিলে তা মেরুদণ্ডে গিয়ে ঠেকতো। এই সময়ে তাঁর সহসা মনে হল, এই তপস্যায় নিজের মোক্ষ হলেও হতে পারে, কিন্তু দুনিয়ার দুঃখকে এভাবে বিনাশ করা সম্ভব নয়। শরীর সুস্থ না থাকলে, নিজেকে মানুষের সেবায় লাগানো যাবে কী করে? তিনি বুঝতে পারলেন এভাবে বোধিলাভ অসম্ভব। সুতরাং তিনি পুনরায় খাদ্য গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলেন। ‘নৈরঞ্জনা’ নদীর ধারে ‘সুজাতা’ নামের এক নারী তাঁকে এক বাটি পায়েস নিবেদন করলো। এই পরমান্ন আহার করে তিনি নদীতে স্নান করলেন। অতঃপর পুনরায় ধ্যানরত হলেন। বোধিবৃক্ষের নীচে। কঠোর তপস্যার পর তিনি বুদ্ধত্বপ্রাপ্ত হলেন। দুঃখ, দুঃখের কারণ, এর প্রতিকার প্রভৃতি সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করলেন। এ ঘটনাটিই বোধিলাভ নামে পরিচিত।

রবীন্দ্রনাথের ‘কথা’ কাব্যগ্রন্থে ‘নগর লক্ষী’ নামে আরেকটা কবিতা রয়েছে। বুদ্ধ এখানে এক দুর্ভিক্ষের সময়ে তাঁর ভক্তদের ডেকে ক্ষুধিতদেরকে অন্নদান সেবা করতে আহবান জানালেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে শেঠ, সামন্ত, রাজা– কেউই সাহস পেলো না এই গুরু ভার নিতে। তখন অনাথপিণ্ডদের কন্যা সুপ্রিয়া ভিক্ষুণী সকলকে অবাক করে দিয়ে ভিক্ষাপাত্র তুলে নিয়ে বলল,
“আমার ভান্ডার আছে ভরে
তোমা সবাকার ঘরে ঘরে……
ভিক্ষা অন্নে বাঁচাব বসুধা-
মিটাইব দুর্ভিক্ষের ক্ষুধা”।

এভাবেই বৌদ্ধ ধর্মে ‘ভিক্ষা’ একটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে আছে। ইংরেজীতে একে alms giving বলে। লুয়াং প্রেবাং এর Alms Giving Ceremony জগৎবিখ্যাত।

আজ আপনাদেরকে এই গল্পই শোনাব। বিস্মরণের প্রান্ত ছুঁয়ে যাওয়া আমার ভ্রমণের স্মৃতি থেকে। খুব সকালে ঘুম থেকে জাগলাম। বৃষ্টিস্নাত সকাল। মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত লাওসে বর্ষাকাল। যখন-তখন মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। অথচ গতরাতে ঘুমিয়ে যাবার পূর্বে আমি আকাশে ধ্রুবতারা, কালপুরুষ – সবই দেখেছি। অথচ এখন চারদিকে অস্পষ্ট কুয়াশা। একটু দূরে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে নেমে আসা ঝর্ণার ভেতরকার স্বচ্ছ জলের প্রবাহের ধ্বনি ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। হোটেলের সামনের রাজপথে তখনো চলাচল শুরু হয়নি।

শুধুমাত্র রাস্তার পাশের ফুলের গাছ থেকে থোকায় থোকায় হলুদ-সোনালী বর্ণের ফুল ঝুলে আছে। ফুটপাতের ওপরে। দৃষ্টিনন্দন এই ফুলকে আমাদের দেশে ডাকি সোনালু বলে। ইংরেজি নাম ‘golden shower tree’। লাওসে সোনালুর ফোটা ফুলকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় ডক খঊন (dok khoun)। তাদের নতুন বছরের উৎসবের সাথে জড়িত। লাওসের মানুষ এই ফুল দিয়ে মন্দিরে অর্ঘ দেয়। ঘরের মধ্যে ঝুলিয়ে রাখে। বিশ্বাস করে নতুন বছরে এই ফুল তাদের পরিবারের জন্য বয়ে নিয়ে আসবে শান্তি, সৌভাগ্য ও আনন্দ। একটু দূরে মেকং। এর জলও থমকে আছে।সারা প্রকৃতিতে একটা নিবিড় পবিত্র ভাব। দূরে পাহাড়ের চুড়ায় একটা মন্দিরের সোনালী চূড়া দৃশ্যমান। দূর থেকে দেখতে আমাদের দেশের সোনালু ফুলের মতো।

মিস্টার জ্যাকসন ঠিকই বলেছিলেন। অদ্ভুত দৃশ্য অপেক্ষা করছিল আমার জন্যে। সামনেই রাস্তার বাঁক। ফুটপাতের ওপরে হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে আছে কয়েক যুবকযুবতী। সবার সামনে পাত্র। পাত্রের ভেতরে স্টিকি রাইস, কলা অথবা কোন ফল। অনেক দূর থেকে লম্বা লাইনে এগিয়ে আসছে বৌদ্ধ মঙ্কদের দল। দূর থেকে মরুভূমির ভেতরে উটের কাফেলার মতো মনে হয়। প্রতিজন মঙ্ক এসে একেকজন ভিক্ষা প্রদানকারী বা প্রদানকারিনীর সামনে থামছে। দুই পক্ষই নিঃশব্দ।খুব সল্প সময়ের জন্যে। প্রদানকারী বা প্রদানকারিনী হাঁটু গেড়ে অথবা মোড়ায় বসে তার পাত্রের ভেতর থেকে এক মুঠো স্টিকি রাইস তাদের পাত্রের ভেতরে তুলে দিচ্ছেন। পরম মমতায় ও শ্রদ্ধায়।

আমি অবাক চোখে তাকিয়ে থাকি এই অনির্বচনীয় দৃশ্যপটের দিকে। মনে পড়ে যায় কাহলিল গিব্রানের বিখ্যাত ‘প্রফেট’ কবিতার লাইন, “There are those who give with joy, and that joy is their reward.”

(এটি গত বইমেলায় প্রকাশিত আমার লেখা ভ্রমণ বই ‘মেকং এর নাকফুল’ এর একটা অধ্যায় থেকে উদ্ধৃত। বৌদ্ধ পূর্নিমা উপলক্ষে পোস্ট করলাম।)

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৮:২৩ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৪ মে ২০২৩

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া
সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭। সম্পাদক কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি), মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

ফোন : ০১৯১৪৭৫৩৮৬৮

E-mail: [email protected]