সোমবার ২০শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

চীনা ইউয়ান বেশি ব্যবহার করে বাংলাদেশসহ যে ৮ দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বৃহস্পতিবার, ১১ মে ২০২৩ | প্রিন্ট

চীনা ইউয়ান বেশি ব্যবহার করে বাংলাদেশসহ যে ৮ দেশ

কয়েক বছর ধরে চীন বিদেশে তাদের মুদ্রার লেনদেন বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করছে। মূলত মার্কিন ডলারের আধিপত্য ঠেকানোর চেষ্টা আকারে চীন এমনটি করে আসছে। দেশে দেশে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লেনদেনে এবং রিজার্ভ বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে যেন ইউয়ান রাখা হয় সেজন্য নানাবিধ উপায়ে কাজ করছে চীন।

এসব প্রচেষ্টার ফলও পেয়েছে চীন। এরই মধ্যে দেশটির মুদ্রা ব্যবসা-বাণিজ্যে, আন্তর্জাতিক লেনদেনে, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় লেনদেনে ও বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভে ইউয়ানের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। খবর: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’র।

যদিও মার্কিন ডলারের লেনদেনের তুলনায় তা নগন্য। ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টসের তথ্য মতে, এখনও পৃথিবীব্যাপী যা বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনের ৯০ শতাংশ ডলারে হচ্ছে। তবে বাংলাদেশসহ আটটি দেশে ইউয়ানের ব্যবহারের ব্যপ্তি বাড়াচ্ছে। দেখার বিষয়, এই ব্যবহার বৃদ্ধির তাৎপর্য কী?

দক্ষিণ আমেরিকা থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ ডলারের পাশাপাশি ইউয়ান ব্যবহারের নানা উপায় অবলম্বন করছেন। গত মার্চে চীনে বৈদেশিক লেনদেনে প্রথমবারের মতো মার্কিন ডলারকে পেছনে ফেলে শীর্ষে চলে আসে ইউয়ান।

১. রাশিয়া

ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানোর ফলে পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞাগুলোর কারণে রাশিয়ার অর্থনীতি বেশ বেকায়দায় রয়েছে। পরিস্থিতির কারণে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।

লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান টিএস লোমবার্ড’র প্রধান চীন বিষয়ক অর্থনীতিবিদ ররি গ্রিন জানান, রাশিয়ায় অফশোর ইউয়ানের ব্যবহার ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ছিল শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ, আর এই জানুয়ারিতে দেখা যায় তা ২ দশমিক ৫৭ শতাংশে ঠেকেছে।

বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ে ইউয়ানের ব্যবসা বিবেচনায় হংকং, ব্রিটেন, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাষ্ট্রের পর পঞ্চম শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে মস্কো।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গ্যাস কোম্পানি গ্যাজপ্রম গত সেপ্টেম্বরে জানিয়েছে, ইউয়ান ও রুবলে লেনদেন চালু করতে চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের সঙ্গে সমঝোতা সই করেছে। রাশিয়ার শীর্ষ স্বর্ণ উৎপাদনকারী কোম্পানি পলিয়াসসহ অনেকেই বন্ড মার্কেট থেকে ইউয়ানে অর্থ উত্তোলনও শুরু করেছে।

গত অক্টোবরে প্রথমবারের মতো মস্কোয় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ডলারকে ছাড়িয়ে সর্বোচ্চ বেচাকেনা হয় ইউয়ানের।

এই এপ্রিলে রাশিয়ায় চীনের রপ্তানি ১৫৩ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ বেড়েছে আর আমদানি বেড়েছে ৮ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।

২. সৌদি আরব

গত মার্চে খবরে জানা যায়, তেল বিক্রির ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের পরিবর্তে চীনা ইউয়ান গ্রহণের কথা ভাবছে সৌদি আরব। ডিসেম্বরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সৌদি আরব সফরের পরই এমনটি শোনা যায়। ক্ষমতাধর দুটি দেশের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উম্মোচনের কথাও বলা হয়। শি জিনপিং ওই সময় গ্যাস ও তেলের বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানোর কথাও বলেন।

সৌদি আরব সফরকালে শি জিনপিং জানান, তেল ও গ্যাসের ব্যবসায় ইউয়ানের ব্যবহার বৃদ্ধিতে ‘সাংহাই পেট্রোলিয়াম’ এবং ‘ন্যাচারাল গ্যাস এক্সচেঞ্জ’, এই দুটি প্ল্যাটফর্মকে পুরোদস্তুর কাজে লাগানো হবে।

৩. আর্জেন্টিনা

এপ্রিলের শেষভাগে আর্জেন্টিনার সরকার জানায়, চীন থেকে পণ্য আমদানিতে তারা মার্কিন ডলারের বদলে ইউয়ানে মূল্য পরিশোধ করতে চায়। চীনের রাষ্ট্রদূত জৌ জিয়াওলি এবং বেশকিছু চীনা কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর আর্জেন্টিনার অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রী সার্জিও মাসা নিশ্চিত করে জানান, এপ্রিলে চীন থেকে আমদানি করা পণ্যের ১ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ মূল্য ইউয়ানে পরিশোধ করছে তারা। এবং এটি মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইউয়ানে পরিশোধ করা অর্থের পরিমাণ। চলমান মে মাস থেকে ৭৯০ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের পণ্য প্রতি মাসে চীন থেকে আনার পরিকল্পনা আর্জেন্টিনার।

গত জানুয়ারিতে পিপলস ব্যাংক অব চায়না আর্জেন্টিনার সঙ্গে ইউয়ান লেনদেনের সীমা ৩৫ বিলিয়ন থেকে বাড়িয়ে ১৬৫ বিলিয়ন করে নেয়।

৪. ব্রাজিল

গত ফেব্রুয়ারিতে চীন ও ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যকার সমঝোতার ভিত্তিতে এরই মধ্যে ব্রাজিল ইউয়ানে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ গ্রহণ করছে। ব্রাজিলে একটি ব্যাংক ইউয়ান লেনদেনের বিশেষ দায়িত্ব পেয়েছে। এপ্রিলের শুরুর দিকে সুইফটের চীনা বিকল্প মাধ্যম ‘ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেমে’ ব্রাজিলে ইউয়ানের লেনদেন ব্যাপকভাবে শুরু হয়।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দ্যা সিলভা গত এপ্রিলে চীন সফর করেন। সেসময় তিনি জোটের সদস্য দেশগুলো- ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিজেদের মুদ্রায় পারস্পারিক বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানোর আহ্বান জানান।

চীনের দশম সর্বোচ্চ বাণিজ্য-অংশীদার ব্রাজিল। চীনের সরকারি তথ্য মতে, গত বছর ব্রাজিলের সঙ্গে দেশটির দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৪ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ১৭১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে ঠেকেছে।

ব্রাজিলের ব্যবসায়ী ওয়াল্টার সালকা এ মাসের শুরুতে ব্লুমবার্গের নিউইয়র্কের সদর দপ্তরে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘চীনের মুদ্রা ইউয়ান দিনকে দিন গুরুত্ব পাচ্ছে। ক্ষুদ্র পরিমাণে হলেও কিছু লোক ইউয়ানে আগ্রহী।’

৫. বাংলাদেশ

পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের অর্থ পরিশোধে ইউয়ানের ব্যবহারের ব্যাপারে একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও রাশিয়া। গত মাসে বাংলাদেশ সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ তথ্য জানান। রাশিয়া প্রথমে রুবলে পেমেন্ট করতে বলেছিল। এটি সম্ভব নয় বলে সাফ সানিয়ে দেন বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা উত্তম কুমার কর্মকার।

গত বছর রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের প্ল্যাটফর্ম সুইফট থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে বাংলাদেশ রাশিয়াকে মার্কিন ডলারে রাশিয়াকে অর্থ পরিশোধ করতে পারবে না। ২০১৫ সালে চীনের তৈরি করা ‘ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেমের’ মাধ্যমে ইউয়ানে এই অর্থ শোধ করবে বাংলাদেশ।

৬. পাকিস্তান

চীনের মুদ্রা ইউয়ানের মাধ্যমে মূল্যপরিশোধে রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা শুরু করতে যাচ্ছে পাকিস্তান। জুনের প্রথম সপ্তাহে প্রথম চালানে সাড়ে সাত লাখ ব্যারেল তেল পাকিস্তানে পৌঁছাতে পারে।

গত শুক্রবার (৫ মে) পাকিস্তানের ইংরেজি সংবাদপত্র ‘নিউজ ইন্টারন্যাশনাল’ তাদের এক প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান এই তেলের মূল্য খুবসম্ভবত চীনা মুদ্রা ইঊয়ানে শোধ করবে এবং ব্যাংক অব চায়না এই লেনদেন সম্পন্ন করতে সহযোগিতা করবে।’

৭. ইরাক

গত ফেব্রুয়ারিতে ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, বেসরকারি পর্যায়ের আমদানিকারকেরাও ইউয়ানে মূল্য পরিশোধ করার সুযোগ পাবে। অথচ এর আগে শুধু মার্কিন ডলারে এটি করা যেত। তবে ইরাকের তেল বাণিজ্য ওই ঘোষণার বাইরে রাখা হয়, অর্থাৎ কোনো দেশ চাইলে ইরাককে তার দেশের তেলের মূল্য ইউয়ানে পরিশোধযোগ্য নয়।

৮. থাইল্যান্ড

দ্য ব্যাংকক পোস্ট এপ্রিলের শেষের দিকে এক প্রতিবেদনে জানায়, ব্যাংক অব থাইল্যান্ড ও পিপলস ব্যাংক অব চায়নার মধ্যে ই্উয়ান ও বাথ মুদ্রাভিত্তিক আরও বাণিজ্যের প্রসার বাড়ানোর আলোচনা হয়েছে। এর আগে দুই দেশ ২০২১ সালে তাদের মধ্যকার মুদ্রা-বিনিময় চুক্তি নবায়ন করে। স্থানীয় মুদ্রায় দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটানোর লক্ষ্যে চুক্তিটি করা হয়।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৯:২৫ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১১ মে ২০২৩

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

(237 বার পঠিত)
(204 বার পঠিত)
advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া
সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭। সম্পাদক কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি), মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

ফোন : ০১৯১৪৭৫৩৮৬৮

E-mail: [email protected]