বুধবার ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই আশ্বিন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

৬১ বছর পর স্কুলের বকেয়া বেতন দিলেন সোহরাব আলী

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   শুক্রবার, ০৯ জুন ২০২৩ | প্রিন্ট

৬১ বছর পর স্কুলের বকেয়া বেতন দিলেন সোহরাব আলী

সোহরাব আলী। ১৯৬২ সালে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার ফুলহরি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। সেই সময় বিদ্যালয়ে তার চার মাসের বেতন বকেয়া পড়ে যায়। বেতন দিতে না পেরে স্কুল ছেড়েছিলেন তিনি। পড়ালেখা ছেড়ে কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ ৬১ বছর পর গত মঙ্গলবার সেই বকেয়া পরিশোধ করেছেন তিনি।

সোহরাব আলীর বয়স এখন ৭৫ বছর। জীবনের এই সময়ে এসে তার বকেয়া বেতনের কথা মনে পড়ে। তিনি ছোটবেলার সেই বিদ্যালয়ে গিয়ে বেতন পরিশোধ করেন। বর্তমানে বাজারমূল্য বেশি থাকায় তিনি একসঙ্গে ৩০০ টাকা জমা দিয়েছেন। তিনি জানান, তিনি সচ্ছল নন, তারপরও ঋণী থাকতে চান না। এ কারণে ৬১ বছর আগের বকেয়া বেতন পরিশোধ করলেন তিনি।

সোহরাব আলীর সংসারে রয়েছে স্ত্রী, দুই মেয়ে আর এক ছেলে। থাকেন শৈলকুপা উপজেলার মহম্মদপুর গ্রামে। ছোটবেলায় তিনি পাশের গ্রামের বড়দা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করতেন। পঞ্চম শ্রেণি পাস করে ১৯৬২ সালে বাড়ি থেকে তিন কিলোমিটার দূরে ফুলহরি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। মাত্র ছয় মাস ক্লাস করেছিলেন। পরে আর্থিক অনটনে পড়াশোনা ছেড়ে দেন তিনি।

সোহরাব আলী জানান, তার বাবা দরিদ্র হওয়ায় ঠিকমতো পড়ার খরচ দিতে পারতেন না। বিদ্যালয়ে সেই সময়ে মাসিক চার টাকা বেতন দিতে হতো। তবুও তার চার মাসের বেতন বাকি পড়ে যায়। তিনি খুব লজ্জায় পড়ে যান। তখন পড়ালেখা ছেড়ে তিনি বাবার সঙ্গে মাঠে কাজ শুরু করেন। ১৯৬৮ সালে পুলিশ সদস্য হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে যশোর পুলিশ লাইনসে কর্মরত থাকার সময় স্বল্প বেতনের কারণে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। বাড়ি এসে ব্যবসা শুরু করেন।

সোহরাব আলীর ভাষ্য, ১৯৭১ সালে দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতে চলে যান। তিনি বেতাই ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেন। পুলিশের প্রশিক্ষণ থাকায় অল্প কিছু দিনের মধ্যেই তিনি প্রশিক্ষক হয়ে যান। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন তিনি। পরে দেশ স্বাধীন হলে তিনি বাড়ি এসে আরো ব্যবসা শুরু করেন। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় আসেনি তার নাম।

ছোটবেলায় দেখা বিদ্যালয় আর ৬১ বছর পর বড়বেলায় দেখা বিদ্যালয়, কতটা বদল হলো? জানতে চাইলে সোহরাব আলী জানান, ১৯৬২ সালে তিনি যখন এই বিদ্যালয়ে ভর্তি হন, তখন ছিল টিনের ঘর। প্রধান শিক্ষক ছিলেন মো. মনিরুজ্জামান সিকদার। তিনি মারা গেছেন। ছোটবেলায় তিনি যাদের শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন, তাদের কারো কথা জানেন না এখন। তার সঙ্গে পড়ালেখা করে যারা এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছিলেন, তারাও অবসরে চলে গেছেন। এখন সব তরুণ শিক্ষক। বিদ্যালয়ে এখন একাধিক বড় ভবন। শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। এত বছর পর নিজের ছোটবেলার বিদ্যাপীঠে এসে পার্থক্যটা ‘রাত ও দিন’ মনে হচ্ছে। সবকিছু এত ভালো লাগছে যে নতুন করে তার বিদ্যালয়ে ভর্তির ইচ্ছা হচ্ছিল। তার ভাষায়, ‘মনে হচ্ছিল আবার পড়ালেখা করি, বাচ্চাদের সঙ্গে ছোটাছুটি করি!’

বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী হাদিকুর রহমান জানান, রসিদ কেটে বকেয়া বেতন নিয়েছেন সোহরাব আলী।

ফুলহরি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লক্ষ্মণ প্রসাদ সাহা বলেন, এই বিদ্যালয় ১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত। সোহরাব আলী ভর্তি হন ১৯৬২ সালে। তিনি বেতন দিতে যখন আসেন, তখন তিনি বিদ্যালয়ের কাজে বাইরে ছিলেন। ৬১ বছর পর বেতন পরিশোধ করতে আসায় উপস্থিত অন্য শিক্ষকরা খুব খুশি হয়েছেন। জমা রসিদ দিয়ে তার টাকাটা নেয়া হয়েছে। তার এই কাজে মুগ্ধ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৮:৩৪ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ০৯ জুন ২০২৩

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিজয়ের ছড়া
(164 বার পঠিত)
advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া
সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭। সম্পাদক কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি), মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

ফোন : ০১৯১৪৭৫৩৮৬৮

E-mail: [email protected]