সোমবার ১৭ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

চিংড়ির পোনায় ৫০ হাজার মানুষের জীবিকা

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   সোমবার, ০২ অক্টোবর ২০২৩ | প্রিন্ট

চিংড়ির পোনায় ৫০ হাজার মানুষের জীবিকা

চিংড়ির রেণু পোনা আহরণ ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত সুন্দরবনসংলগ্ন সাতক্ষীরা উপকূলের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। নদীতে ভেসে আসা ‘হোয়াইট গোল্ড’ খ্যাত বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু আহরণ ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন এ উপকূলের মানুষ। তবে রেণু পোনা আহরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ আইনত নিষিদ্ধ জেনেও তারা ধরেন। কেননা এই পোনা বিক্রি করেই চাল কিনে কোনোরকমে সংসার চালাতে হয় তাদের।

উপকূলীয় শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীতে অনেক নারী-পুরুষকে পিঠে দড়ি বেঁধে জাল টানতে দেখা যায়, সুন্দরবনের গহিনের নদী থেকে উজানে ভেসে আসা বাগদা ও গলদার রেণু পোনা ধরার জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নেট দিয়ে তৈরি করা এক ধরনের জাল পেতে অপেক্ষা করছেন অসংখ্য নারী-পুরুষ। কেউ নদী তীরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত জাল টেনেই চলেছেন। কেউ আবার নৌকায় বসে মাঝনদীতে জাল পেতেছেন। জালে আটকে পড়া ক্ষুদ্রাকৃতির গলদা ও বাগদা চিংড়ির রেণু পোনা নিয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে নদীর চরে রাখা গামলাতে উঠিয়ে রাখছেন।

সুন্দরবনের গাঘেঁষা শ্যামনগর উপজেলার দীপ ইউনিয়ন গাবুরার সোরা গ্রামের বাসিন্দা হামিদ গাজী জানান, এলাকায় অন্য কোনো কাজ না থাকায় রেণু পোনা ধরা আইনত নিষিদ্ধ জেনেও জীবিকার তাগিদে ধরেন তিনি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাছ ধরে যা আয় হয়, তাতেই চাল কিনে কোনোরকমে চলে তার সংসার। নদী থেকে ধরা চিংড়ির রেণুগুলো খুব ভালো হয়। বড় ঘের ব্যবসায়ীরা সব কিনে নিয়ে যান।

খোলপোটুয়া নদীর তীরের ডুমুরিয়া গ্রামের মমতাজ বেগম জানান, ছোটবেলা থেকেই বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু ধরেন তিনি। চিংড়ির রেণু ধরেই চলছে তার সংসার। এসব ধরে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। শুধু তিনি নন, খোলপোটুয়া ও কপোতাক্ষ নদের তীরে এমন হাজারো মানুষ চিংড়ির রেণু ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

তিনি আরো বলেন, এগুলো বিক্রি করতে বাইরে কোথাও যেতে হয় না। ফড়িয়ারা (ব্যাপারী) এখান থেকেই কিনে নিয়ে যান। পরে তারা বিভিন্ন আড়ৎ ও ঘের ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন।

শ্যামনগর পরিবেশ উন্নয়ন ক্লাবের সভাপতি আব্দুল হলিম জানান, উপকূলে বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় মাছ শিকারই তাদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। তাই রেণু পোনা ধরা অবৈধ জেনেও উপকূলের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ তারা জীবিকার তাগিদে ধরেন।

তিনি জানান, মাঝে মধ্যে মৎস্য বিভাগ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান হয়, তখন তাদের জরিমানা বা গ্রেফতার হতে হয়। তবে পেটের তাগিদে আবারো এ কাজ শুরু করেন তারা।

পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিসের সাতক্ষীরা ইউনিটের সমন্বয়ক এসএম শাহিন আলম বলেন, বর্তমানে উপকূলীয় আশাশুনির শ্রীউলা, প্রতাপনগর, আনুলিয়া ও শ্যামনগরের কাশিমাড়ী, কৈখালী, রমজাননগর, মুন্সীগঞ্জ, বুড়িগোয়ালিনী, আটুলিয়া, পদ্মপুকুর ও গাবুরার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চিংড়ির রেণু আহরণ ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশ পরিবার রেণু ধরা ও ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সুন্দরবনের ওপর চাপ কিছুটা কমেছে। অভাব-অনটনের এ জনপদের মানুষের সচ্ছলতা ফিরে আসার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এসব চিংড়ির রেণু।

শ্যামনগর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা তুষার মজুমদা বলেন, শ্যামনগর উপজেলায় ২৩ হাজার ৫৩৫জন জেলেকে মৎস্যজীবী কার্ড দেওয়া হয়েছে, যারা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার নদ-নদীতে এভাবে অপরিকল্পিত পন্থায় মাছের পোনা আহরণ মৎস্য সম্পদের জন্য অনেকটা হুমকি মুখে। তবে উপকূলে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি হলেই কেবল মৎস্য সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৭:৫৫ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ০২ অক্টোবর ২০২৩

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া
সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭। সম্পাদক কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি), মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

ফোন : ০১৯১৪৭৫৩৮৬৮

E-mail: [email protected]