মঙ্গলবার ২১শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

মাভাবিপ্রবির বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভ: পরতে পরতে ১৯৭১

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   সোমবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৩ | প্রিন্ট

মাভাবিপ্রবির বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভ: পরতে পরতে ১৯৭১

টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (মাভাবিপ্রবি) ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে সেন্ট্রাল লাইব্রেরি ভবনের পেছনে স্থাপিত শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভটি। দেশপ্রেমের অনন্য ভাস্কর্য হয়ে মাভাবিপ্রবিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এটি। যেসব বুদ্ধিজীবী স্বাধীনতার যুদ্ধে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে গেছেন তাদের স্মৃতিকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে রক্ষিত করে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ভাস্কর্যটির পরতে পরতে লুকিয়ে আছে বাংলার স্বাধীনতার ইতিহাস ও মহান মুক্তিযুদ্ধ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক স্থপতি সৈয়দ সাইফুল কবীর স্থাপনাটির ডিজাইন করেন। ২০১৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মো. আলাউদ্দিন স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

সরেজমিন দেখা যায়, স্মৃতিস্তম্ভটি ভূমি থেকে তিন ফুট ছয় ইঞ্চি ওপরে অবস্থিত। যেহেতু শহিদ বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল রায়েরবাজারের পরিত্যক্ত একটি ইট খোলায়, সে কারণে স্থাপনাটির সামগ্রিক কাঠামোতে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে খোলা ইটের।

স্মৃতিস্তম্ভের ভেতরে কৃত্রিম জলাধার ও জলাধারে পরিত্যক্ত ইটের ব্যবহারকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের আবহকে ইঙ্গিত করতে। বেদির ওপরে বই ও পেন্সিলে কাঠামো রাখা হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের সঙ্গে পাঠ ও লেখনীর চিহ্নকে প্রকাশ করতে। এছাড়া বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগ মহীয়ান করে রাখতে বই ও পেন্সিলকে সমুন্নত রাখা হয়েছে।

বেদির ওপর খোলা বইয়ের এক পৃষ্ঠায় শহিদ বুদ্ধিজীবীদের হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় ধরে নেওয়ার দৃশ্য এবং অন্য পৃষ্ঠায় হত্যাকাণ্ডের পর বদ্ধভূমিতে পড়ে থাকা মৃতদেহের দৃশ্য চিত্রিত হয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভের চারদিকের মাপ ৭১ ফুট রাখা হয়েছে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সাল ১৯৭১ কে নির্দেশ করতে।

মূল বেদিতে চারটি ধাপের সিঁড়ি ব্যবহার করা হয়েছে আমাদের রাষ্ট্রে চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে বোঝাতে। বেদিতে বইয়ের উচ্চতা ১২ ফুট ও পেন্সিলের উচ্চতা ১৪ ফুট রাখা হয়েছে ডিসেম্বরের ১৪ তারিখে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছিল তা নির্দেশ করতে। সর্বোপরি স্মৃতি স্তম্ভটিকে গাম্ভীর্যতা দানের জন্য ধূসর ও কালো রঙের ব্যবহারকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ইট খোলায় মেটে লাল রঙের প্রাধান্য থাকাতে এ রঙটিও ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে স্মৃতি স্তম্ভটিকে ঘিরে ক্ষোভ ও শ্রদ্ধা জাগ্রত হয় মানুষের মনোজগতে।

বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব একাধিক প্রকাশনায় এই স্মৃতিস্তম্ভ বিষয়ে লেখা হয়েছে- মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টাতেই পাকিস্তানি সৈন্য এবং তাদের স্থানীয় দোসররা এ দেশের বুদ্ধিজীবীসহ বাংলার মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা করে। যৌথবাহিনীর কাছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মাত্র দুই দিন আগে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর সর্বোচ্চ সংখ্যক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় বাংলার মাটিতে। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর রাতে অধ্যাপক, সাংবাদিক, ডাক্তার, শিল্পী, প্রকৌশলী, লেখকসহ ২০০জন বুদ্ধিজীবীকে ঢাকায় একত্রিত করা হয়েছিল। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, নাখালপাড়া, রাজারবাগ এবং শহরের বিভিন্ন স্থানের নির্যাতন সেলে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের। পরে তাদের রায়েরবাজার এবং মিরপুরের বধ্যভূমিতে এনে হত্যা করা হয়। এমনকি যুদ্ধ শেষ হলেও ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি চলচ্চিত্র নির্মাতা জহির রায়হানকে মিরপুরে বিহারীরা হত্যা করে। নিহত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ৯৯১জন শিক্ষাবিদ, ১৩ জন সাংবাদিক, ৪৯জন চিকিৎসক, ৪২জন আইনজীবী, ১৬জন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী এবং প্রকৌশলী ছিলেন। মার্চ ২৫ থেকে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন অংশে যেসব বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে তাদের মধ্যে গোবিন্দ চন্দ্র দেব, মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, ড. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি, ডা. আলীম চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার, নিজামউদ্দিন আহমেদ, সেলিনা পারভীন, আলতাফ মাহমুদ, ড. হাবিবুর রহমান, সুখরঞ্জন সমাদ্দার, মীর আব্দুল কলিম, ধীরেন্দ্রাথ দত্ত, রনাদা প্রসাদ সাহা, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোয়াজ্জেম হোসেন ও মামুন মাহমুদের নাম অন্যতম। এসব বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাগ্রত করার লক্ষে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৯:২৪ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৩

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া
সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭। সম্পাদক কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি), মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

ফোন : ০১৯১৪৭৫৩৮৬৮

E-mail: [email protected]