শুক্রবার ১লা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

আদর্শিক রাজনীতি কেন ব্যবসায়ীদের পকেটে

ইঞ্জিনিয়ার ফকর উদ্দিন মানিক:   |   রবিবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৪ | প্রিন্ট

আদর্শিক রাজনীতি কেন ব্যবসায়ীদের পকেটে

রাজনীতিতে এদেশ এক চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। আগে ব্যবসায়ীরা সরাসরি রাজনীতি না করে অন্যের জন্য টাকা লগ্নি করলেও এখন নিজেরাই নেমে পড়ছেন রাজনীতিতে যার কারণে বদলে যাচ্ছে রাজনীতির সমীকরণ । এটা কি ব্যবসায়িক রাজনীতি নাকি রাজনীতির ব্যবসা? এ দেশে রাজনীতি কি বর্তমানে পেশা, নাকি ব্যবসা? নাকি ব্যবসা ও পেশা দুটোই। ত্যাগী রাজনীতিবিদদের আত্নত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশের রাজনীতি ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ীদের আধিপত্য বাড়ছে। ফলে রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের একি সাথে রথ দেখা কলা বেচার পাশাপাশি ব্যবসায়িক রাজনীতির রৌদ্রছায়ার লুকোচুরির খেলার প্রতিনিয়ত হাজারো নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। কিন্তু সবার একটাই প্রশ্ন এই নাটক বন্ধে বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে?

সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার গঠন ও নীতি নির্ধারণের প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে সংসদ । সেই সংসদের চিত্র ও চরিত্রের বিস্তার দেখলে সহজেই বোধগম্য হবে রাজনীতি কতটা জনবান্ধন। এটা সর্বজনবিদিত যে বাংলাদেশের নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্যের কথা ওপেন সিক্রেট । পরিশ্রম ও ত্যাগের তুলনায় এখন অর্থবিত্তই মনোনয়নের প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থ সম্পদের বিকাশ ও মুনাফা অর্জনের জন্য ব্যবসায়ীরা স্রোতের মতো রাজনীতিতে আসার ফলে দেশে রাজনীতি ও ব্যবসা একাকার হয়ে গেছে।বর্তমান রাজনীতিতে টাকাই যেহেতু সব সেখানে ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক বিনিয়োগ করে সংসদে আধিপত্য করবে এটাই স্বাভাবিক। কেউ হুট করে আমলা, প্রশাসনের উর্ধতন কর্মকর্তা, আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা বড় ব্যবসায়ী হতে না পারলেও চাইলেই রাজনীতিবিদ হতে পারেন । সাবেক রাষ্ট্রপতি’র ভাষায় তাই রাজনীতিও হয়ে গেছে গরিবের ভাবির মতো।

স্বাধীনতার পর সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া প্রতিটি সংসদে ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেড়েছে। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ১৯৯ জন ব্যবসায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন যা মোট সাংসদের দুই-তৃতীয়াংশ শতকরা হিসেবে ৬৭ শতাংশ। বিদায়ী সংসদেও ব্যবসায়ীর সংখ্যা ছিল ১৮২ । উল্লেখ্য, ৫৪-এর সংসদে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব মাত্র ৪ শতাংশ হলেও ১৯৭৩ সালে তা এসে দাঁড়ায় ১৩ শতাংশ, ক্রমান্বয়ে ১৯৭৯ সালে ৩৪ শতাংশ, ১৯৯১ সালে ৩৮ শতাংশ , ১৯৯৬ সালে ৪৩ শতাংশ , ২০০১ সালে ৫৮ শতাংশ ও ২০০৮ সালে ৫৭ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে ৫৯ শতাংশ। জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া দাপটে রাজনীতির নাটাই বহুলাংশে ব্যবসায়ীদের হাতে আছে বলে অনেকেই এখন সংসদকে এফবিসিসিআইয়ের বর্ধিত অংশ বলে আখ্যায়িত করছেন কি?

‘গ্রেসামস ল’ এর মতো—খারাপ রাজনীতিবিদদের কারণে ত্যাগী রাজনীতিবিদরা ক্রমাগতভাবেই রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে হয় বিতাড়িত হচ্ছেন। এর ফলে রাজনীতি হয়ে পড়ছে নীতি-আদর্শ বিবর্জিত একটি কার্যক্রম। বস্তুত ক্ষমতার রাজনীতিতে কালো টাকার মালিকদের কারণে আদর্শিক রাজনীতির মৃত্যু হচ্ছে। আর এসব দেখে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন, ‘রাজনীতি ব্যবসায়ীদের পকেটে চলে গেছে!”। অর্থের প্রভাবে রাজনীতির বিরাজনীতিকরণ হওয়ায় জাতীয় পার্টির নেতা অ্যাডভোকেট কাজী ফিরোজ রশীদদের ভাষায় রাজনীতির মঞ্চগুলো আস্তে আস্তে ব্যবসায়ীরা দখল করছেন। দেশ চালাচ্ছেন জগৎ শেঠরা। অথচ স্বাধীনতার জন্য আত্নত্যাগকারী রাজনীতিবিদরাই মৃতপ্রায়।

গণতান্ত্রিক দেশে রাজনীতি করার অধিকার সবারই আছে। কিন্তু, দেশসেবার নামে রাজনীতিতে ঢুকে ব্যবসায়ীরা এবং ব্যবসায় ঢুকে রাজনীতিকরা উভয়ই রাজনীতির মূল লক্ষ্যই নষ্ট করে দিচ্ছেন । বর্তমানে রাজনীতির গিভ অ্যান্ড টেকের অপর নাম ব্যবসা। এর ফলস্বরূপ ব্যবসায়ীরাই এখন রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারক।।যদিও আদর্শ রাষ্ট্র গঠনে প্লেটোর ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থে ব্যবসায়ীদের রাজনীতি করার অধিকার রাখেননি। হয়তো এই জন্যই বিল গেটস, ওয়ারেন বাফেট, টাটা, আম্বানি, বিড়লা, ইলোন মাস্ক, জেফ বেজোসরা কোটি কোটি ডলারের মালিক হয়েও রাজনীতিতে পা বাড়াননি। আগের রাজনীতিবিদদের মধ্যে টাকা কামানোর প্রবণতা ছিল না। এজন্য মহাত্মা গান্ধী, মার্টিন লুথার কিং, জওহরলাল নেহরু, নেলসন ম্যান্ডেলা, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। এখন তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে টাকা। ফলে আদর্শিক রাজনীতি এখন আইসিইউতে মুমূর্ষু অবস্থায় আছে ।

আইন প্রণয়ন, জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছা, সরকারের আয়-ব্যয় ও বাজেট অনুমোদন করা একজন সাংসদের মূল দায়িত্ব। এসব দায়িত্বের মধ্যে জনগণের সেবার লক্ষ্যে কাজ করা ছাড়া আর্থিক কোনো সুবিধা নেই। তাহলে সাংসদ হওয়ার আকর্ষণটা কোথায়? বেশিরভাগের সংসদ সদস্য হওয়ার উদ্দেশ্য ডিউটি ফ্রি গাড়ি, বিলাস বহুল বাড়ি, কম দামে প্লট ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে বিত্তবৈভবের মালিক হওয়া। কথায় আছে, ‘শিয়ালের কাছে মুরগি পাহারায় রাখলে শিয়ালই তা সাবাড় করে।’ অর্থাৎ একজন ব্যবসায়ীর কাছে রাজনীতি বর্গা দিলে রাজনীতিটাই গিলে ফেলবে। তাই ভক্ষককে রক্ষকের কাছে দায়িত্ব না দিয়ে জনহিতৈষী রাজনীতিবিদকে দায়িত্ব দিলে তা অবশ্যই দেশ ও জনগণের জন্য কল্যাণকর হবে।

বর্তমানে এদেশে রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের অনুপ্রবেশ সাংঘাতিক আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সময়ে এই নষ্ট প্রবণতা ছিলো না। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পরে সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান ‘টাকা কোনো সমস্যা নয়’ তত্ত্ব দিয়ে ‘রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি কঠিন করে তোলা’র নীতি নিয়ে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের দিয়ে বিএনপি গঠন করেন। জিয়াকে হত্যার পর তারই দেখানো পথে সামরিক শাসক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও জাতীয় পার্টি গঠন করেন আমলা, সেনাসদস্য, অস্ত্র ও টাকার ওপর ভিত্তি করে। এরশাদের পরে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত সরকারে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের আধিপত্য ছিলো যা এখনও চলমান। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগের কাছে দেশের সাধারণ মানুষ ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট মুক্ত রাজনীতি প্রত্যাশা করে।

কথায় আছে ‘বিড়ালের পাখা গজাতে দিলে ঘরের চালের শান্তিকামী চড়ুইপাখিগুলোর জীবনসংহার হতো। এ দেশের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও কল্যাণের স্বার্থে ব্যবসায়ী বিড়ালের পাখা গজাতে দেওয়া উচিৎ নয় । সম্ভবত রাজনীতিবিদদের আদর্শচ্যুতির কারণে ব্যবসায়ীদের মতো খেলোয়াড়, ব্যবসায়ী, শিল্পী, নায়ক, গায়ক, আমলা, পেশাজীবী সবাই এমপি হতে চান। একবার এমপি হওয়া মানেই যেন আলাদীনের চেরাগ পাওয়া৷

মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-যুবকদের সাথে নিয়ে জীবনবাজি রেখে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রাজনীতিবিদরা। কিন্তু অর্থবিত্তের অভাবে তারা আজ অবহেলিত হওয়ায় তাদেরই আত্মত্যাগের সুবিধাভোগী হচ্ছে ব্যবসায়ীরা। আমরা যদি এখনই প্রকৃত রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদের পার্থক্য বুঝতে না পারি, তাহলে ভবিষ্যতে দুঃখ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। তাই দেশপ্রেমিক, ত্যাগী, নির্লোভ, সৎ ও জনহিতৈষী রাজনীতিবিদদের কাছে রাজনীতিকে ফিরিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে রাজনীতি রাজার নীতি নয় বরং নীতির রাজা ৷

লেখক – ইঞ্জিনিয়ার ফকর উদ্দিন মানিক
সদস্য – কৃষি ও সমবায় বিষয়ক কেন্দ্রীয় উপ-কমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ।
সভাপতি – কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই এসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৬:২৩ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৪

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া
সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭। সম্পাদক কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি), মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

ফোন : ০১৯১৪৭৫৩৮৬৮

E-mail: [email protected]