শুক্রবার ২৬শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

দেশে ফিরে হাজিদের করণীয় কী?

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪ | প্রিন্ট

দেশে ফিরে হাজিদের করণীয় কী?

হজের শাব্দিক অর্থ ‘জিয়ারতের সংকল্প’। হজ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম এবং অকাট্য একটি ফরজ ইবাদত। মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্য লাভের এক মহামিলন অনুষ্ঠান হচ্ছে হজ। হজের এ বিধানটি বিশ্ব-ভ্রাতৃত্বের উৎকৃষ্ট নিদর্শন।

হজ ফরজের জন্য শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য থাকা জরুরি। আর হজ পালনকারীরা আল্লাহ তাআলার মেহমান। তারা অনেক কষ্ট করে শারীরিক ও আর্থিক এই ইবাদত সম্পাদন করেছেন। তাদের উদ্দেশ্যে হজ পরবর্তী করণীয় ও দিকনির্দেশনা দিয়ে মহান আল্লাহ আয়াত নাজিল করেন। এ আয়াতে মহান আল্লাহ তাদের উদ্দেশ্যে কী বলেন?

হজ পালনকারীদের উদ্দেশ্যে তাদের বাকি জীবনের করণীয় সম্পর্কে মহান আল্লাহ তাআলা কোরআনুল কারিমে ইরশাদ করেন, فَإِذَا قَضَيْتُم مَّنَاسِكَكُمْ فَاذْكُرُوا اللَّهَ كَذِكْرِكُمْ آبَاءَكُمْ أَوْ أَشَدَّ ذِكْرًا ۗ فَمِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا وَمَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ

অর্থ: ‘অতঃপর যখন তোমরা (হজের) যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করে নেবে, তখন (মিনায়) এমনভাবে আল্লাহর (জিকির) স্মরণ করবে, যেমন (জাহেলি যুগে) তোমরা তোমাদের পিতৃপুরুষগণকে স্মরণ করতে অথবা তার চেয়েও বেশি গভীরভাবে (স্মরণ করবে)। এমন কিছু লোক আছে যারা বলে- হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দুনিয়াতে (সাওয়াব) দান কর। মূলত তাদের জন্য পরকালে (কল্যাণের) কোনো অংশ নেই’। (সূরা: বাকারা, আয়াত: আয়াত: ২০০)

পরের আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরো বলেন, وَ مِنۡهُمۡ مَّنۡ یَّقُوۡلُ رَبَّنَاۤ اٰتِنَا فِی الدُّنۡیَا حَسَنَۃً وَّ فِی الۡاٰخِرَۃِ حَسَنَۃً وَّ قِنَا عَذَابَ النَّارِ

অর্থ: পক্ষান্তরে তাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা বলে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান কর এবং পরকালেও কল্যাণ দান কর। আর আমাদেরকে দোজখের যন্ত্রণা থেকে রক্ষা কর’। (সূরা: বাকারা, আয়াত: আয়াত: ২০১)

ইসলাম পূর্ব যুগে আরবের লোকেরা হজ সম্পাদন করেই মিনায় মেলার আয়োজন করতো। তাই আল্লাহ তাআলা জাহেলি যুগের সে রীতির পরিবর্তন করে মানুষকে নির্দেশ দেন যে, হজের পর মেলা নয় বরং আল্লাহর স্মরণই সর্বোত্তম। আর তা মৃত্যু পর্যন্ত অব্যাহত রাখা আবশ্যক।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হজের উদ্দেশ্যে যাওয়া লোকদেরকে তাদের নিজ নিজ দেশে ফিরে কি করতে হবে তা বর্ণনা করেছেন বিশ্বনবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি বলেছেন-

(১) হজরত কাব বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো সফর থেকে ফিরে আসতেন, তখন মসজিদে (নফল) নামাজ আদায় করতেন’। (বুখারি)

আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনে আর্থিক ও শারীরিক ইবাদত হজের দীর্ঘ সফর শেষে যখন কোনো মানুষ নিজ বাড়িতে ফিরবে তার উচিত নিজ মহল্লার মসজিদে গিয়ে ২ রাকাত নামাজ আদায় করা অতঃপর ঘরে ফেরা। এ নামাজ আদায় করা প্রিয়নবির অনুসরণীয় সুন্নত আমল’।

মসজিদ থেকে ২ রাকাত নামাজ আদায় করে নিজ ঘরে প্রবেশের পরও শুকরিয়া স্বরূপ ২ রাকাআত নামাজ আদায় করা মোস্তাহাব। হাদিসে এসেছে-

(২) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যখন তুমি ঘর থেকে বের হবে, তখন ২ রাকাত নামাজ পড়বে। এ নামাজ তোমাকে ঘরের বাইরের বিপদাপদ থেকে হেফাজত করবে। আর যখন ঘরে ফিরবে, তখনও ২ রাকাত নামাজ আদায় করবে। এ নামাজ তোমাকে ঘরের অভ্যন্তরীণ বালা-মুসিবত থেকে হেফাজত করবে’। (মুসনাদে বাজ্জার)

নিরাপদে হজ পালন করে দেশে ফিরে আসার পর শুকরিয়া স্বরূপ গরিব-মিসকিন ও আত্মীয়স্বজনকে খাবারের দাওয়াত দেয়াও বৈধ। হাদিসে এসেছে-

(৩) হজরত জাবের বিন আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় এসেছেন, তখন একটি পশু জবাইয়ের নির্দেশ দেন। জবাইয়ের পর সাহাবায়ে কেরাম তা থেকে আহার করেছেন’। (বুখারি)

হজ পরবর্তী সময়ে বেশি বেশি এ জিকির করা- رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

উচ্চারণ: ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ্‌দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখেরাতি হাসানাতাও ওয়া ক্বিনা আজাবান নার’। (সূরা: বাকারা, আয়াত: আয়াত: ২০১)

অর্থ: ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান কর এবং পরকালেও কল্যাণ দান কর। আর আমাদেরকে দোজখের যন্ত্রণাদায়ক আগুণ থেকে রক্ষা কর’।

আমাদের জানা উচিত যে, লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে হজ পরবর্তী সময়ে বিশাল আয়োজনের ব্যবস্থা করা ইসলাম সমর্থন করে না। যেখানে সমাজের উঁচু থেকে নিচু সব শ্রেণির মানুষ আসবে আর আয়োজনকারীকে বাহবা দেবে। এমনটি যেন না হয়। মূল কথা হলো- হজ পালনকারীর প্রতিটি কাজই হবে আল্লাহ সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।

সুস্থ শরীরে সুন্দর ও নিরাপদে হজ পালন করে বাড়ি ফেরার পর বেশি বেশি আল্লাহর স্মরণে নিজেকে নিয়োজিত করাই হবে একজন হজ পালনকারীর কাজ। শুধু তা-ই নয়, হজ পরবর্তী জীবনের প্রতিটি কাজই হবে কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে।

তাই হজ থেকে ফিরে আসার পর স্থানীয় লোকজন যেমন হজ পালনকারীকে শুভেচ্ছা জানাবে তেমনি হজ পালনকারী ব্যক্তিও তার শুভাকাঙ্ক্ষীদের জন্য কল্যাণের দোয়া করবেন। পরস্পর মুসাহাফা ও কোলাকুলি করবেন। দোয়ার আয়োজন করবেন। এমনটি করা মোস্তাহাব।

তবে কোনোভাবেই ফুল দিয়ে বরণ বা ফুলের মালা বিনিময় কিংবা স্লোগান দেওয়াসহ ইত্যাদি আয়োজন করা ঠিক নয়।

হজ পালনকারীরা পবিত্র নগরী মক্কা থেকে আসার সময় যদি জমজমের পানি নিয়ে আসেন তবে তা লোকদেরকে পান করানো মোস্তাহাব। অসুস্থ ব্যক্তিদের আরোগ্য লাভের নিয়তে পান করানোও বৈধ। হাদিসে এসেছে- ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (বাইতুল্লাহ জেয়ারত করে আসার সময়) জমজমের পানি সঙ্গে নিয়ে আসতেন’। (তিরমিজি)

সর্বোপরি কথা হলো, হজে মাবরুর নসিব হলে হজপালনকারী ব্যক্তি সদ্য প্রসূত ভূমিষ্ঠ শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যায়। তাই হজ পালনকারী ব্যক্তি হজ পরবর্তী জীবনে নিজেকে নিষ্পাপ কুলুষমুক্ত রাখতে দুনিয়ার সব কাজেই আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করা একান্ত জরুরি।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর সব হজ পালনকারীকে কোরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক আমৃত্যু জীবন-যাপন করার তাওফিক দান করুন। হজ করেছেন বিধায় নামাজ আদায় করা দরকার কিংবা লোকে হাজি বলবে এ নিয়ত পরিহার করার তাওফিক দান করুন।

ইয়া আল্লাহ! সব মুসলিম উম্মাহকে ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর সঙ্গে সঙ্গে মনের পশুকেও কোরবানি করে পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়ার তাওফিক দান করুন। এবং হজ করার পর কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনা মোতাবেক জীবনযাপন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৯:০৬ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া
সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭। সম্পাদক কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি), মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

ফোন : ০১৯১৪৭৫৩৮৬৮

E-mail: [email protected]