মুফতি মুহাম্মদ আল আমিন | সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট | ৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
অত্যাচার-অবিচারইসলামপূর্ব যুগে এতিম ও বিধবার কোনো অধিকার সমাজে প্রতিষ্ঠিত ছিল না। বাবা মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অসহায় সন্তানদের প্রতি শুরু হতো অত্যাচার-অবিচার ও জুলুমনিপীড়ন।
তাদের অধিকার দেওয়া তো হতোই না; বরং এতিম শিশুদের জন্য বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ কেড়ে নেওয়ার জন্য শুরু হতো ষড়যন্ত্র। অনুরূপভাবে কোনো নারীর স্বামী মারা যাওয়ার পর স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে তার কোনো অধিকার ছিল না। ইসলাম এতিমের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে।
বিধবাকে মর্যাদা দিয়েছে।
এতিমদের অধিকার ও মর্যাদা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘এতিমদের তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দাও। খারাপ মালামালের সঙ্গে ভালো মালামালের অদলবদল কর না। আর তাদের ধনসম্পদ নিজেদের ধনসম্পদের সঙ্গে সংমিশ্রিত করে তা গ্রাস কর না। নিশ্চয় এটা বড়ই মন্দ কাজ।
’ সুরা : নিসা, আয়াত ২। এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, এতিমদের সম্পদ দখল করা যাবে না। তাদের সম্পত্তি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে। নিজের সম্পদের সঙ্গে তাদের সম্পদ মেলানো যাবে না। তবে যদি ভালো উদ্দেশ্যে হয় তাহলে মেলানো যাবে।
ভালো উদ্দেশ্য বলতে বোঝায়, যদি এমন হয় যে নিজের ব্যবসার সঙ্গে এতিমের টাকা বা সম্পদ মিলিয়ে ব্যবসা করলে যে লাভ আসবে তা আনুপাতিক হারে ভাগ করে যার যার অংশ সে পাবে। তাহলে এটা অবশ্যই উত্তম। বরং সওয়াবের কাজ। এতিম-বিধবার জন্য উপার্জন করার মতো কেউ না থাকলে তাদের প্রতি দান-অনুদান অব্যাহত রাখতে হবে। তাকে সহযোগিতা করতে হবে। ব্যক্তিগত অনুদান, জাকাত ও ফিতরা দিয়ে এতিম ও বিধবাদের পাশে আমরা দাঁড়াতে পারি। হাদিসের কিতাবগুলোতে এতিম ও বিধবাকে দান করার ব্যাপারে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে।
রসুল (সা.) বলেন, বিধবা ও অসহায়দের তত্ত্বাবধানকারী ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জেহাদকারীর মতো। অর্থাৎ যারা অসহায় ও বিধবার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়াবে তারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার মতো সওয়াব পাবে। হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবি বলেন, আমার ধারণা আল্লাহর রসুল (সা.) এ-ও বলেছেন, বিধবা ও অসহায়দের তত্ত্বাবধানকারীর মর্যাদা ওই ব্যক্তির মতো, যে অলসতা না করে সারা রাত জেগে ইবাদত করে এবং ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিন রোজা রাখে। বুখারি ও মুসলিম। এই হাদিস দ্বারা বিধবা ও অসহায়দের সহযোগিতাকারী ও দায়িত্ব বহনকারী ব্যক্তির ফজিলত ও মর্যাদা বোঝাতে গিয়ে প্রিয় নবী (সা.) তিনটি সওয়াবের কথা উল্লেখ করেছেন।
এক. আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার সওয়াব। দুই. নিয়মিত রাত জেগে নফল নামাজ পড়ার সওয়াব। তিন. নিয়মিত নফল রোজা রাখার সওয়াব। এত বিশাল সওয়াব আমরা পেতে পারি এতিম-বিধবাদের সাহায্য-সহযোগিতা করে। এতিমকে সাহায্য-সহযোগিতা করার ফজিলত উল্লেখ করতে গিয়ে প্রিয় নবী (সা.) আরও বলেন, আমি এবং এতিমের অভিভাবক জান্নাতে এভাবে থাকব, এই কথা বলে তিনি হাতের শাহাদাত ও মধ্যমা এই দুই আঙুল দ্বারা ইশারা করলেন এবং উভয়ের মাঝে কিঞ্চিৎ ফাঁক রাখলেন। অর্থাৎ হাতের দুই আঙুল যেমন একান্ত পাশাপাশি, তেমনি রসুল (সা.) ও এতিমের অভিভাবক একসঙ্গে জান্নাতে থাকবে। বুখারি শরিফ। অপর হাদিসে ইরশাদ হচ্ছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো এতিমের মাথায় হাত বুলাবে যেসব চুলের ওপর দিয়ে তার হাত অতিক্রম করবে এর প্রতিটির বিনিময়ে তার জন্য সওয়াব লেখা হবে। আর যে ব্যক্তি তার তত্ত্বাবধানে লালিতপালিত এতিম বালক-বালিকার সঙ্গে ভালো আচরণ করবে, আমি ও সেই ব্যক্তি বেহেশতে এই দুটির মতো একত্রে থাকব। এই কথা বলে তিনি নিজ হাতের আঙুল দুটি মেলালেন। মুসনাদে আহমদ, তিরমিজি। যে ঘরে এতিম লালিতপালিত হয় সেই ঘর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ঘর।
এ প্রসঙ্গে বিশ্ব মানবতার মুক্তির অগ্রদূত হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘মুসলমানদের সেই ঘরটি সর্বোত্তম, যেখানে কোনো এতিম আছে এবং তার প্রতি ভালো ব্যবহার করা হয়। আর মুসলমানদের সেই ঘরটি সর্বাপেক্ষা মন্দ যাতে কোনো এতিম আছে অথচ তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয়।’ ইবনে মাজাহ। মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের এতিম ও বিধবার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ানোর তৌফিক দান করুন। আমিন
লেখক: খতিব, সমিতি বাজার মসজিদ, নাখালপাড়া, ঢাকা