শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

বালিশ-কাণ্ডের চেয়েও বড় দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে এলো রূপপুরে

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

বালিশ-কাণ্ডের চেয়েও বড় দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে এলো রূপপুরে

বালিশ-কাণ্ডকে ছাপিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে এবার সামনে এসেছে আরও বড় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। বিশেষ নিরীক্ষায় দেখা গেছে, ৯ বছরে প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ২৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকার অডিট আপত্তি উঠেছে। শুধু বহুল আলোচিত বালিশ কেনাই নয়, গ্রিন সিটি আবাসন প্রকল্পে অতিরিক্ত বিল, যন্ত্রপাতি ক্রয়ে অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ এবং চুক্তি বাস্তবায়নে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগও উঠে এসেছে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি, তদারকি এবং সময়মতো কাজ শেষ হওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংশ্লিষ্ট পরিদর্শন ও নিরীক্ষা সংস্থাগুলো। বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তরের (ফাপাড) বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং আইএমইডির পরিদর্শন প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, দুই ইউনিটে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। শুরুতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রকল্পের মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। পরবর্তী সময়ে ২২ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি করে ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। মোট ব্যয়ের মধ্যে ৯ বছরে খরচ হয়েছে প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা।

আরও পড়ুন
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন ও উত্তর
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন ও উত্তর

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ২৩০টি অডিট আপত্তি তোলা হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। প্রথম পাঁচ অর্থবছরেই ৪১ হাজার ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ৮ হাজার ৬০৬ কোটি টাকার অনিয়ম ধরা পড়ে। ২০২১-২২ অর্থবছরে আপত্তির পরিমাণ ছিল ১০৬ কোটি টাকা। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকায়। সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ধরা পড়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে। ওই বছর ১৬ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ১৫ হাজার ২০৭ কোটি টাকার অডিট আপত্তি তোলে ফাপাড। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও ৩ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকার অডিট আপত্তি রয়েছে।

বিশেষ নিরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে রূপপুর প্রকল্পের আওতায় নির্মিত গ্রিন সিটি আবাসন এলাকায়। রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের জন্য নির্মিত এই আবাসন প্রকল্পকে কেন্দ্র করেই ২৩০টি অডিট আপত্তির মধ্যে ১২০টি আপত্তি তোলা হয়েছে। এসব আপত্তির বড় অংশই নির্মাণকাজ, যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র কেনা এবং বিল পরিশোধসংক্রান্ত। নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনায় সরকারি মূল্যের তুলনায় অনেক বেশি বিল পরিশোধ করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে দরপত্রে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেখানো হলেও অন্যকিছু পণ্যের দাম কম দেখিয়ে মোট দরকে ‘গ্রহণযোগ্য’ রাখা হয়েছে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের আড়ালে অতিরিক্ত ব্যয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অনিয়মের অন্যতম উদাহরণ গ্রিন সিটির ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম ও জেনারেটর ক্রয়।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সরঞ্জামের সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ২৭ কোটি টাকা। অথচ একই সরঞ্জাম কেনায় বিল পরিশোধ করা হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ শুধু এই একটি খাতেই অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৮৭ কোটি টাকা। একটি ভবনের হিসাবেই এই পার্থক্য আরও স্পষ্ট। উচ্চ ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম, ট্রান্সফরমার, নিু ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, পাওয়ার ফ্যাক্টর কারেকশন প্যানেল এবং জেনারেটরের সরকারি মূল্য ছিল ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। কিন্তু একই সরঞ্জামের জন্য বিল করা হয়েছে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এতে একটি ভবনেই অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।

রূপপুর প্রকল্পের সবচেয়ে আলোচিত অনিয়ম ছিল বালিশ কেনা। বিশেষ নিরীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রকল্পে ৪ হাজার ৭০২টি বালিশ কেনা হয়। এর মধ্যে ৬০টি বালিশের প্রতিটির দাম ধরা হয় ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা। বালিশগুলোর প্রকৃত মূল্য ছিল ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অথচ এগুলো কেনা হয় ৫ কোটি ৪১ লাখ টাকায়। এতে সরকারের প্রায় ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়।

তবে বিশেষ নিরীক্ষার তথ্য বলছে, বালিশকাণ্ড ছিল অনিয়মের একটি ছোট অংশ। গ্রিন সিটির ২০টি আবাসিক ভবনের নির্মাণ ও ক্রয় কার্যক্রম পর্যালোচনা করে নিরীক্ষকরা ২৯৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির তথ্য তুলে ধরেছেন। এসব ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ, মূল্য নির্ধারণে অসংগতি এবং চুক্তির শর্ত অনুসরণ না করার অভিযোগ করা হয়েছে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

ফলো করুন আজকের অগ্রবাণী-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া