Advertise with us

ছয় মাসে সীমান্তে ১০৯৭ কোটি টাকার চোরাচালান জব্দ

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৩ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

ছয় মাসে সীমান্তে ১০৯৭ কোটি টাকার চোরাচালান জব্দ

দেশের সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানবিরোধী অভিযানে গত ছয় মাসে প্রায় ১ হাজার ৯৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকার অবৈধ পণ্য জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিজিবির বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন ও সদর দপ্তরের অভিযানে এসব পণ্য জব্দ করা হয়।
উদ্ধার করা পণ্যের মধ্যে রয়েছে সোনা, মাদক, অস্ত্র, রুপা, প্রসাধনী, পোশাক, ইলেকট্রনিকসসহ অন্তত ৪০ ধরনের সামগ্রী।

বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, এর আগে ২০২৫ সালে সীমান্ত এলাকা থেকে ১ হাজার ৯০৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার এবং ২০২৪ সালে ২ হাজার ১৮৫ কোটি ৩ লাখ টাকার চোরাচালান পণ্য জব্দ করা হয়েছিল।

সর্বশেষ সোমবার ফেনীর সীমান্ত এলাকায় পৃথক অভিযানে ৬৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা মূল্যের ভারতীয় শাড়ি, চকোলেট ও একটি মিনিট্রাক জব্দ করে বিজিবি। একই দিন খাগড়াছড়ির যামিনীপাড়া সীমান্তে সশস্ত্র চোরাকারবারিদের সঙ্গে বিজিবির গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।
এ সময় চারটি অস্ত্র, ১৪ রাউন্ড গুলি, পাঁচ রাউন্ড এফসিসি এবং ১ হাজার ৬০০ ভারতীয় রুপি উদ্ধার করা হয়।

জব্দ হচ্ছে নানা ধরনের পণ্য

বিজিবির হিসাবে, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে আনা-নেওয়ার সময় যেসব পণ্য জব্দ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে সোনা, রুপা, মাদকদ্রব্য, ভারতীয় শাড়ি, থ্রি-পিস, প্রসাধনী, মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক পণ্য, সিগারেট, বিদেশি কাপড়, চিনি, সার, খাদ্যপণ্য, গবাদি পশু, মাছ, কৃষিপণ্য, ওষুধ, মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ এবং বন্য প্রাণীর অংশ।

গত জুন মাসে ৩০৭ কোটি ৬৫ লাখ ১১ হাজার টাকা মূল্যের চোরাচালান পণ্য জব্দ করে বিজিবি। এর মধ্যে ছিল ৫ কেজি ৫৯২ গ্রাম সোনা, ১৮ হাজার ১৫টি শাড়ি, ৯ হাজার ৫৫১টি তৈরি পোশাক, প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার প্রসাধনসামগ্রী, ১৭ লাখের বেশি আতশবাজি, কাঠ, কয়লা, চিনি, জিরা, চিংড়ির পোনা, ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্য।

কেন বাড়ছে চোরাচালান

সংশ্লিষ্টদের মতে, সীমান্তে চোরাচালান বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে দুই দেশের বাজারে পণ্যের দামের পার্থক্য, উচ্চ শুল্ক, সীমান্ত এলাকার ভৌগোলিক জটিলতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সংকট অন্যতম।

বিশ্লেষকদের মতে, এক দেশে কম দামের পণ্য অন্য দেশে বেশি দামে বিক্রি হওয়ার সুযোগকে কাজে লাগায় চোরাকারবারিরা। পাশাপাশি বৈধ আমদানিতে বেশি খরচ হওয়ায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধ পথ বেছে নেয়।
সীমান্তের ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের দীর্ঘ স্থলসীমান্তের বড় অংশ নদী, চর, পাহাড় ও দুর্গম এলাকায় অবস্থিত।
এসব এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো কঠিন হওয়ায় চোরাকারবারিরা বিভিন্ন কৌশলে সক্রিয় থাকে।

সীমান্তবর্তী এলাকার কিছু মানুষ দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের অভাবে চোরাচালান চক্রের সহযোগী হিসেবে যুক্ত হয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমান্ত এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে ৫৯ বিজিবির উদ্যোগে চালু করা হয়েছে ‘সীমান্ত ডিজিটাল স্কিল সেন্টার’। সেখানে বেকার যুবকদের মোবাইল ফোন মেরামতের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতিতে প্রভাব

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চোরাচালানের প্রভাব শুধু রাজস্ব ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অবৈধ পথে আসা পণ্য বাজারে কম দামে বিক্রি হওয়ায় বৈধ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। একই সঙ্গে দেশীয় শিল্প, সরকারি রাজস্ব এবং অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

আইন-শৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, চোরাচালানের রুট ব্যবহার করে মানবপাচার, মাদক ব্যবসা, জাল মুদ্রা সরবরাহ ও অন্যান্য আন্তঃদেশীয় অপরাধও সংঘটিত হতে পারে।
অভিযান জোরদার করছে বিজিবি

বিজিবির অপারেশন উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল মো. মাহবুব মুর্শেদ রহমান বলেন, সীমান্তে অস্ত্র, মাদক ও অন্যান্য চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। সীমান্তের চ্যালেঞ্জ ও বাস্তব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চোরাচালানবিরোধী কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

তিনি বলেন, মাদক ও চোরাচালান দমন শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর দায়িত্ব নয়; এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। ড্রোন, থার্মাল ক্যামেরা, স্মার্ট সেন্সর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কার্যকর নজরদারি বাড়ানো যেতে পারে।

তিনি বলেন, সীমান্ত এলাকার মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করা গেলে চোরাচালান চক্রের স্থানীয় সহযোগিতা কমবে। আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগও জরুরি।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us

ফলো করুন আজকের অগ্রবাণী-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া