নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট | ০ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
দেশের মানুষের প্রতিদিনের খাবারের থালায় এবার নতুন আতঙ্ক মাইক্রোপ্লাস্টিক। রান্নার সয়াবিন তেল থেকে শুরু করে চিনি ও শিশুর জন্য কেনা দুধ সবখানেই মিলেছে এই অতি ক্ষুদ্র্র কণা। দেশের তিনটি পৃথক গবেষণায় এই দূষণের প্রমাণ মিলেছে। গবেষকরা মনে করেন, প্রতিদিন অজান্তেই হাজারো প্লাস্টিক কণা শরীরে প্রবেশ করছে। যা ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ পরিচালিত গবেষণায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। পরীক্ষায় প্রতিটি নমুনাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। প্রতি লিটার তেলে গড়ে পাওয়া গেছে ৫৩ হাজার ৯২২টি কণা। এর মধ্যে ব্র্যান্ডেড বোতলজাত তেলে গড়ে ৪৮ হাজার ৬৭টি ও খোলা তেলে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি কণা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ খোলা তেলে দূষণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিশ্বখ্যাত জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস এপ্রিলে এই গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। এতে সয়াবিন তেলে ছয় ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার তথ্য রয়েছে। এছাড়া নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এলসেভিয়ারেও একটি গবেষণা প্রকাশ হয়েছে। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে তেজগাঁও এলাকা থেকে সংগ্রহ করা খোলা তেলের নমুনায় সবচেয়ে বেশি দূষণ পাওয়া যায়। তাদের ধারণা, প্লাস্টিকের পাত্রের পুনর্ব্যবহার, খোলা অবস্থায় খাদ্য বিক্রি ও সংরক্ষণে অনিয়ম এবং শিল্পাঞ্চলের পরিবেশ এসব দূষণের অন্যতম কারণ। বোতলজাত তেলেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ায় উৎপাদন, পরিশোধন, প্যাকেজিং ও পরিবহণের বিভিন্ন ধাপকে সম্ভাব্য উৎস হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিসে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া সাত ধরনের ব্র্যান্ডেড ও খোলা চিনির নমুনা পরীক্ষায় ৯৫ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। প্রতি কেজি চিনিতে ২১০ থেকে ৫০৮টি পর্যন্ত কণা শনাক্ত হয়েছে। ব্র্যান্ডেড চিনিতে গড়ে ৩২২টি ও খোলা চিনিতে ৪০৩টি কণা পাওয়া গেছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন গবেষক সাদিয়া আফরিন, নায়ন হোসেন এবং মোস্তাফিজুর রহমান। গবেষণার জন্য ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বাজার থেকে সংগ্রহ করা সাত ধরনের বাণিজ্যিক চিনির ব্র্যান্ডেড ও খোলা উভয় ধরনের চিনি পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষকদের মতে-উৎপাদন, পরিশোধন, সংরক্ষণ, পরিবহণ এবং প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের বিভিন্ন ধাপ থেকেই এসব কণা চিনিতে মিশেছে।
অন্যদিকে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরাও একটি গবেষণা করেছেন। তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত কাঁচা দুধ, বাজারজাত তরল ও গুঁড়া দুধ এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যের ৪১টি নমুনা পরীক্ষা করে প্রতিটির মধ্যেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পেয়েছেন।
এতে বলা হয়েছে, প্রতি ১০০ মিলিলিটার ব্র্যান্ডের দুধে গড়ে ১৫৬ দশমিক ৬টি, কাঁচা দুধে ৯৩ দশমিক ৩৯টি এবং দুগ্ধজাত পণ্যে ৭০ দশমিক ৮০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। গবেষকদের আশঙ্কা, দুধ সংগ্রহ, পরিবহণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেটজাত করার বিভিন্ন ধাপেই প্লাস্টিক কণা খাদ্যে যুক্ত হয়েছে।
তিনটি গবেষণাতেই পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পিইটি, নাইলন, পিভিসি, পলিইউরেথেন, টেফলনসহ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পলিমারের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে আঁশ বা ফাইবারজাতীয় কণা, যা কৃত্রিম তন্তুর পোশাক, প্লাস্টিকের যন্ত্রপাতি, ফিল্টার, পাইপ, প্যাকেজিং উপকরণ কিংবা বাতাসের মাধ্যমে খাদ্যে মিশতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণার তথ্যমতে, শুধু সয়াবিন তেল থেকেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির শরীরে বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা ঢুকছে। অন্যদিকে দুধের ওপর নির্ভরতা বেশি হওয়ায় শিশুদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের সম্ভাব্য হার আরও বেশি। যদিও গবেষণাগুলো সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট রোগের কারণ হিসাবে মাইক্রোপ্লাস্টিককে চিহ্নিত করেনি। তবে দীর্ঘমেয়াদে শরীরে এসব কণা জমে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং অন্যান্য জটিল স্বাস্থ্যসমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।